প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য পাসপোর্ট এখন শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, বরং বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। কিন্তু সেই পাসপোর্ট পেতে গিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে পড়তে হচ্ছে দুর্ভোগ, দালালচক্র এবং ঘুস বাণিজ্যের ভয়াবহ জালে। সম্প্রতি বিভিন্ন অনুসন্ধান, অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক সুসংগঠিত দুর্নীতির চিত্র, যেখানে ‘চ্যানেল মাস্টার’ নামে পরিচিত বিশেষ কিছু কর্মচারীর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই চক্রে জড়িত রয়েছেন অফিসপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দালাল, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্ট আবেদন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে তথ্য সংশোধন, জরুরি ডেলিভারি, পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন করা এবং নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। এসব অর্থের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে ভাগবাঁটোয়ারা হয় সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি এই দুর্নীতির অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি দাবি করেন, পাসপোর্ট অফিসের ঘুস বাণিজ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সিন্ডিকেট। এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন তথাকথিত ‘চ্যানেল মাস্টার’। মূলত তিনি দালালদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সেই অর্থ বণ্টনের দায়িত্ব পালন করেন।
সূত্র বলছে, অধিকাংশ অফিসেই হিসাবরক্ষক অথবা উপসহকারী পরিচালক পর্যায়ের কেউ এই দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন কত আবেদন জমা পড়েছে, তার মধ্যে কতগুলো দালাল চ্যানেলের মাধ্যমে এসেছে এবং সেখান থেকে কত টাকা আদায় হয়েছে—সবকিছুর খুঁটিনাটি হিসাব থাকে তাদের কাছে। সাধারণ আবেদনকারীরা যেখানে দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ সম্পন্ন করতে পারেন না, সেখানে দালালের মাধ্যমে আবেদন জমা দিলে দ্রুত সব কাজ সম্পন্ন হয়। এর জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও আবেদনকারীকে অতিরিক্ত দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৯টি অফিসে পাসপোর্ট আবেদন গ্রহণ করা হয়। এসব অফিসকে আবেদনসংখ্যার ভিত্তিতে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যেসব অফিসে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ে, সেগুলোকে সবচেয়ে লাভজনক পোস্টিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব অফিসে বদলি বা পদায়ন পেতে কর্মকর্তাদেরও গোপনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়।
বিশেষ করে রাজধানী ও বড় শহরের কিছু অফিসে প্রতিদিন হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অফিসে সপ্তাহে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়। সেই টাকা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্দিষ্ট সময়ে রাজধানীর প্রধান কার্যালয়েও পাঠানো হয় ‘বিশেষ খাম’। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব খামে থাকে নগদ টাকা, যা গোপনে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, আবেদনপত্রে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে দালালচক্রের ফাইল আলাদা করা হয়। ফলে সাধারণ আবেদনকারীর ফাইল পড়ে থাকে, অথচ দালালের মাধ্যমে আসা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এতে করে সাধারণ মানুষ এক ধরনের মানসিক চাপের মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবেই দুর্নীতিকে একটি ‘সিস্টেম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
পাসপোর্ট সেবাগ্রহীতাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশোধনের জন্য তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়। কখনও কখনও পুলিশ ভেরিফিকেশন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্যও ঘুস দাবি করা হয়। বিদেশগামী শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি দেখা যায়। অনেকেই সময়মতো পাসপোর্ট না পেয়ে বিদেশযাত্রার সুযোগ হারান।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অতীতেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালিয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সে সময় কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং একটি গোপন প্রতিবেদনে বহু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। তবে পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেই তদন্তের অনেকটাই থমকে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। বরং কোথাও কোথাও দালালচক্রের ওপর কড়াকড়ি বাড়ানোর পর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থায় অনেকে এখন দালাল ছাড়া কাজ হবে না বলেই বিশ্বাস করেন।
সুশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। একই সঙ্গে বদলি-বাণিজ্য বন্ধ, কর্মকর্তাদের নিয়মিত নজরদারি এবং অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতির এই চক্র আরও গভীরে শিকড় গেড়ে বসবে।
পাসপোর্টের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সেবাকে ঘিরে যদি এমন অবিশ্বাস, দালালতন্ত্র ও ঘুস সংস্কৃতি চালু থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা বলছেন, একজন সাধারণ নাগরিক যেন কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই নির্ধারিত ফি দিয়ে সেবা পেতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গীকার।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনেকেই কথা বলতে রাজি হননি। কেউ কেউ দাবি করেছেন, আগের তুলনায় দুর্নীতি কমেছে এবং প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দুর্নীতির যে জাল তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে হলে প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাধীন তদন্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।