প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি যখন নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তখন জ্বালানি বাজারে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যেও India স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে তারা Russia থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে United States বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে রুশ তেল পরিবহনে আবারও অস্থায়ী ছাড় দিয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ব্যবহারের জন্য নতুন করে ৩০ দিনের সাধারণ লাইসেন্স বা অস্থায়ী ছাড়পত্র জারি করে। আগের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই এই সিদ্ধান্ত আসে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে এবং উন্নয়নশীল ও জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ পাবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি Scott Bessent সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে হঠাৎ সংকট তৈরি হলে তা সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতির দেশগুলোতে। তাই সীমিত সময়ের জন্য এই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় না চীন কম দামে বিপুল পরিমাণ রুশ তেল কিনে এককভাবে মজুদ করে রাখুক। বরং অন্যান্য দেশও যেন তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ পায়, সেটিই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য।
তবে ওয়াশিংটনের এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় দেশটির পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার (১৯ মে) ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দিক বা না দিক, ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানির নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। তিনি জানান, ভারত নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজারদর এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই রুশ তেল কিনছে এবং ভবিষ্যতেও সেই নীতি বজায় থাকবে।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারত একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা ধরে রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লি এখন এমন এক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে যেখানে জাতীয় স্বার্থই প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর বিরুদ্ধে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার রাজস্ব কমিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ভারত, চীনসহ কয়েকটি বড় অর্থনীতি কম দামে রুশ তেল কিনে নিজেদের জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ নিয়েছে।
বিশ্ববাজারে যখন অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির, তখন ছাড়মূল্যে রাশিয়ার তেল ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা তৈরি করেছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশটির বিপুল জনসংখ্যা, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়। ফলে তুলনামূলক কম দামে রুশ তেল পাওয়ায় ভারতের আমদানি ব্যয় অনেকটাই কমেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত রাশিয়া থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরের মধ্যে এটিই ভারতের সর্বোচ্চ রুশ তেল আমদানির পর্যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভারতীয় বাজারে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার আরও সুবিধা পাবে।
তবে এ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে উদ্বেগও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু নীতিনির্ধারক মনে করেন, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি অব্যাহত থাকলে মস্কো যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। যদিও ভারত বরাবরই বলছে, তারা কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রয়োজন থেকেই তেল কিনছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক অস্ত্রেও পরিণত হয়েছে। রাশিয়া তার জ্বালানি সম্পদকে কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সেই শক্তিকে সীমিত করতে চাইছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝখানে ভারত নিজেদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
চীনের প্রসঙ্গও এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, যদি বাজারে রুশ তেলের প্রবাহ সীমিত হয়ে যায়, তাহলে চীন কম দামে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাজারে ভারসাম্য আরও নষ্ট হতে পারে। সেই কারণেই সীমিত সময়ের জন্য হলেও মার্কিন প্রশাসন ছাড়পত্র দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও বিশ্ববাজারের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের জ্বালানি নীতির প্রতিটি পরিবর্তনই আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন প্রভাব তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, রাশিয়ার তেল ঘিরে বৈশ্বিক কূটনীতি এখন নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার এই জটিল সমীকরণে ভারত নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে—বৈশ্বিক চাপের চেয়ে দেশের জ্বালানি চাহিদাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।