ঢাকার সড়কে এআই প্রযুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ অটোরিকশা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
ঢাকার সড়কে এআই প্রযুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ অটোরিকশা

প্রকাশ:  ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করেছে Dhaka Metropolitan Police। আধুনিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ব্যস্ত সড়কে স্থাপন করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় এআই ক্যামেরা, যা মুহূর্তেই শনাক্ত করছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিভিন্ন ঘটনা। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই কঠোর নজরদারির মধ্যেও রাজধানীর সড়কে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এআই ক্যামেরাগুলো লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট না পরা মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে। এরপর সফটওয়্যার থেকে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল মামলা, যা সরাসরি পাঠানো হচ্ছে গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বরে।

গত ৭ মে থেকে রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে এআই ট্রাফিক নজরদারি চালু হয়। শুরুতেই শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় ও এয়ারপোর্ট সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ক্যামেরা বসানো হয়। প্রথম সপ্তাহেই তিন শতাধিক ডিজিটাল মামলা রেকর্ড করা হয় বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।

কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস ও ট্রাক চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক চালক এখন সিগন্যাল অমান্য বা বেপরোয়া চালানোর ক্ষেত্রে সতর্ক হচ্ছেন, কারণ স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা মুহূর্তেই নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে মামলা তৈরি করছে।

তবে পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে রাজধানীর অটোরিকশা পরিস্থিতি। নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য যানবাহন যেখানে এআই ক্যামেরার নজরদারির কারণে ট্রাফিক আইন মেনে চলার চেষ্টা করছে, সেখানে অটোরিকশাগুলো চলছে প্রায় সম্পূর্ণ বেপরোয়া গতিতে। উল্টো পথে চলাচল, হঠাৎ সড়কে ঢুকে পড়া, সিগন্যাল অমান্য এবং জেব্রা ক্রসিং দখল করার মতো ঘটনা নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে ৩০০ ফিট সড়ক, কুড়িল-বাড্ডা, আগারগাঁও, মিরপুর, পল্লবী, গুলিস্তান ও মগবাজার এলাকায় অটোরিকশার দাপট সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব যান ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি গতিতেও চলাচল করছে, যা নগর সড়কের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ও নম্বরপ্লেটের অভাব। এআই ক্যামেরা যেহেতু নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে মামলা তৈরি করে, তাই নিবন্ধনবিহীন এসব যানবাহন প্রযুক্তির নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। সম্প্রতি নতুনবাজার এলাকায় উল্টো পথে দ্রুতগতিতে আসা একটি অটোরিকশার সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ প্রায় ঘটে যায়। চালকের দ্রুত ব্রেক করার কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিনই এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

শুধু দুর্ঘটনা নয়, অটোরিকশার কারণে নগরীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানজটও বাড়ছে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এবং নিয়ম না মানার কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে পড়ছে।

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, এআই প্রযুক্তি চালুর পর রাজধানীতে আইন মানার হার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বড় একটি অংশের অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনকে নিয়ে। বিশেষ করে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে না আসলে এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেন, যেসব যানবাহনের নম্বরপ্লেট নেই, এআই সেগুলো শনাক্ত করতে পারে না। তবে সব ধরনের যানবাহনকে আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে ঈদের পর বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ট্রাফিক ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় অগ্রগতি। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধান না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তাদের মতে, অটোরিকশার মতো অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনকে সুষ্ঠু নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার সড়ক ব্যবস্থা এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতায় চলছে—একদিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অন্যদিকে পুরোনো ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের দাপট। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না হলে শুধু এআই ক্যামেরা বসিয়েই শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলছেন, প্রযুক্তি আসায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও সড়কে নিরাপত্তার মূল সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে প্রতিদিনই ঝুঁকির মুখে থাকবে নগরবাসী।

সব মিলিয়ে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তি নতুন আশা জাগালেও বাস্তব চিত্র বলছে, নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশার কারণে সেই উদ্যোগ এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়ে উঠতে পারেনি। প্রযুক্তি ও নীতিগত সংস্কারের সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সড়ক শৃঙ্খলা অর্জন কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত