প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান OpenAI এবং এর প্রধান নির্বাহী Sam Altman–এর বিরুদ্ধে করা মার্কিন ধনকুবের Elon Musk–এর মামলা খারিজ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, মামলাটি আইনি সময়সীমার অনেক পরে দায়ের করা হয়েছে, তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
এই রায়ের ফলে ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যান বড় ধরনের আইনি চাপ থেকে আপাতত মুক্তি পেলেও প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোচিত এই মামলার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠার সময় ইলন মাস্ক ছিলেন অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের একজন। তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। তখন ওপেনএআইকে একটি অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, যা মানবকল্যাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন করবে।
পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বাণিজ্যিক রূপ নেয় এবং চ্যাটজিপিটি’র মতো বিপ্লবী প্রযুক্তি বাজারে আনে। এরপর থেকেই মাস্কের সঙ্গে ওপেনএআই নেতৃত্বের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মাস্কের অভিযোগ ছিল, প্রতিষ্ঠানটি মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে গোপনে বাণিজ্যিক লাভের দিকে ঝুঁকেছে এবং এতে প্রাথমিক নৈতিক চুক্তি ভঙ্গ হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ওপেনএআই-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা দাতব্য কাঠামোর সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তার মতে, এটি এক ধরনের বিশ্বাসভঙ্গ এবং জনস্বার্থবিরোধী কার্যক্রম। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি স্যাম অল্টম্যানকে বোর্ড থেকে অপসারণ এবং ক্ষতিপূরণের দাবিও জানান।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ড ফেডারেল আদালতে এই মামলার শুনানি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলে। দীর্ঘ শুনানির পর জুরি বোর্ড মাত্র দুই ঘণ্টার আলোচনায় সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, আইন অনুযায়ী মামলাটি করার নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্স ইলন মাস্কের সব দাবি খারিজ করে দেন।
আদালতের এই রায়ের পর ওপেনএআই পক্ষ দাবি করে যে, প্রতিষ্ঠানকে চিরকাল অলাভজনক রাখার কোনো লিখিত বা আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাদের আইনজীবীরা আরও বলেন, মাস্ক পরবর্তীতে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কোম্পানি xAI চালু করার পর থেকেই ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আসছেন, যা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে।
এই মামলায় প্রযুক্তি জগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মাইক্রোসফটের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও। শুনানিতে উঠে আসে, ওপেনএআই বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি, যার বাজারমূল্য শত শত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপেনএআই-এর এই বিপুল আর্থিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই মূলত প্রতিষ্ঠাতা পর্যায়ের দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তুলেছে। একসময় যেসব ব্যক্তি একসঙ্গে মানবজাতির জন্য এআই প্রযুক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়েছিলেন, আজ তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক ও নীতিগত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।
স্যাম অল্টম্যান আদালতের বাইরে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া না দিলেও তার পক্ষের বক্তব্য ছিল, ওপেনএআই এখন একটি বৃহৎ প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে এবং এটি কেবল গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এর কাঠামো ও ব্যবসায়িক মডেল সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক।
অন্যদিকে ইলন মাস্ক বরাবরই ওপেনএআই-এর এই পরিবর্তনকে সমালোচনা করে আসছেন। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটি মানবকল্যাণের আদর্শ থেকে সরে গিয়ে কর্পোরেট লাভকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি নিজেও এআই প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নিতে নিজের কোম্পানি xAI চালু করেন।
বর্তমানে ওপেনএআই-এর বাজারমূল্য আনুমানিক ৮৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই বিশাল মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য আইপিও পরিকল্পনা প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই মামলার রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা এবং নৈতিকতা নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওপেনএআই ও ইলন মাস্কের দ্বন্দ্ব তাই এখন কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বরং পুরো এআই শিল্পের দিকনির্দেশনা নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে আদালতের এই রায় আপাতত ওপেনএআই-এর জন্য স্বস্তি আনলেও প্রযুক্তি দুনিয়ায় ইলন মাস্ক ও ওপেনএআই দ্বন্দ্ব যে আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে, তা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।