প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আলোচনায় থাকা এই কাঠামোগত সংস্কার এখন আবারও সরকারি উচ্চপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজস্ব খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে এনবিআরকে দুই ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সেই সময় একটি অধ্যাদেশ জারি করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কাঠামোগত অস্পষ্টতার কারণে দীর্ঘ আন্দোলন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি আগামী বৈঠকে বিষয়টির ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা। কিন্তু প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, যা কার্যকর কর ব্যবস্থাপনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা একাধিক কার্যপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একই সংস্থা নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন উভয় দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এতে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব একই সঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করায় নীতিগত কাজ ও প্রশাসনিক কাজের ভারসাম্য ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সাল থেকেই রাজস্ব নীতি ও প্রশাসন আলাদা করার বিষয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালে গঠিত একটি পরামর্শক কমিটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা পর্যালোচনা করে এই দুই কার্যক্রম আলাদা করার সুপারিশ দেয়। পাশাপাশি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও একই ধরনের মতামত প্রদান করে, যেখানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে আলাদা অধিদপ্তর গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ পৃথকভাবে পরিচালিত হবে। নীতি বিভাগ সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্য নীতি ও রাজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করবে, আর ব্যবস্থাপনা বিভাগ সরাসরি কর আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে দুই ধরনের দক্ষতা আলাদা করে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে বলে নীতিনির্ধারকদের ধারণা।
তবে এই কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে নানা মতভেদ রয়েছে। একাংশ মনে করছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনলে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব আদায়ে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থীরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
এদিকে সংশোধিত প্রস্তাবে রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব নিয়োগে অভিজ্ঞতার শর্ত আরও কঠোর করা হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার নয়, বরং বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও কর আহরণে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, নতুন কাঠামো কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, বাজেট কাঠামো এবং আইনি কাঠামো—সবকিছুই পুনর্গঠন করতে হবে। এ কারণে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজস্ব খাতের সাবেক কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সংস্কার সফল হলে দেশের কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একসঙ্গে প্রয়োজন হবে।
বর্তমানে বিষয়টি সংসদের আসন্ন অধিবেশনে নতুন করে বিল আকারে উপস্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের রাজস্ব প্রশাসনে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে এনবিআর বিভাজন নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া এই আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রশাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে, যা আগামী দিনে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।