ইরান ইস্যুতে তাইওয়ানের অস্ত্র চুক্তি আটকাল যুক্তরাষ্ট্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
ইরান যুদ্ধের অজুহাতে তাইওয়ানের কাছে ১৪শ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত। ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য সামরিক প্রস্তুতি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কার মধ্যে তাইওয়ানের জন্য নির্ধারিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হং কাও সিনেটের এক শুনানিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত ধরে রাখতে চায়। এ কারণেই তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে এবং প্রশাসন প্রয়োজন মনে করলে এই বিক্রয় কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই অস্ত্র প্যাকেজটি ছিল তাইওয়ানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক চুক্তিগুলোর একটি। গত জানুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেস এ চুক্তির অনুমোদন দিলেও তা কার্যকর করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। তবে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল সামরিক প্রয়োজনের কারণে নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশও হতে পারে। কারণ সম্প্রতি বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই বৈঠকের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাইওয়ানের অস্ত্র চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, তাইওয়ানের অস্ত্র চুক্তিকে ওয়াশিংটন এখন কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি চাইলে এই অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন। এমন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নতা তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। তাইপেইর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক সহযোগিতার বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। এ কারণে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি সবসময়ই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আইনে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এদিকে তাইওয়ানের সরকারও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তাইওয়ানের প্রধানমন্ত্রী চো জুং-তাই জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এই অস্ত্র ক্রয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখবে।

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থগিতাদেশ তাইওয়ানের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক মন্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত তাইওয়ানের জনগণ ও সরকারের মনে মার্কিন সমর্থনের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি করতে পারে। এর ফলে দেশটির অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতি এখন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নেয়, তাহলে এশিয়া অঞ্চলে তাদের সামরিক মনোযোগ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি চীনের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার কথা বিবেচনা করছেন। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে গত কয়েক দশকের কূটনৈতিক প্রথায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলেছে, যাতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এমন পদক্ষেপ নিলে বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সম্পর্ক নয়, বরং চীন, ইরান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত