প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের কৃষি খাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ২৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কৃষি খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে ঋণ খেলাপির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতা দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্বল তদারকি, বেনামি ঋণ বিতরণ এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়লেও তা লক্ষ্য অনুযায়ী হয়নি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছে দিতে পারলেও সেই ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহৃত ও পরিশোধ হচ্ছে না। ফলে নতুন করে ঋণ খেলাপির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আদায় প্রক্রিয়াও প্রত্যাশিত হারে সফল হচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কৃষি খাতে বেনামি ঋণ বিতরণের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। বিশেষ করে অতীত সময়ে কিছু আর্থিক নীতি ও দুর্বল নজরদারির কারণে অনিয়মিতভাবে ঋণ বিতরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ এখন আদায় হচ্ছে না, যা ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণে রূপ নিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভারসাম্যে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের মার্চে এসব ব্যাংকের কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ ছিল দুই হাজার সাতশো নয় কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তেরো হাজার চারশো আঠারো কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে খেলাপি ঋণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। গত বছরের তুলনায় এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়, যেখানে ঋণ খেলাপির পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম, তবে সেখানেও ঋণ খেলাপির চাপ বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বকেয়া ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। গত বছরের মার্চে কৃষি খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তেইশ হাজার কোটি টাকায়। এই বকেয়া ঋণের বড় অংশ যদি সময়মতো পরিশোধ না হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় এই অস্থিরতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষকরা যদি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে নতুন ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে, যা উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে কৃষি ঋণ আদায়ে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে অনিয়মিত ঋণ বিতরণ রোধ করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু কঠোর নীতি নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা এবং কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের ক্ষতি এবং বাজারমূল্যের ওঠানামার কারণে কৃষকরা ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না, যা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সব মিলিয়ে কৃষি খাতে ঋণ ব্যবস্থাপনার এই সংকট ব্যাংকিং খাত এবং কৃষি অর্থনীতির জন্য এক বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী দিনে খেলাপি ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।