প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পশ্চিমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি স্থগিত করেছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে কিছু চলমান প্রকল্পের অর্থপ্রদানও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির মধ্যেই রিয়াদের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সরকার পশ্চিমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন কাজের চুক্তি আপাতত বন্ধ রেখেছে। শুধু তাই নয়, কিছু বিদ্যমান প্রকল্পের বিল পরিশোধও বিলম্বিত করা হয়েছে। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে, তারা কোনো বিল পরিশোধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, কিছু অর্থপ্রদান জুন মাস পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই পদক্ষেপ কেবল সাময়িক আর্থিক সমন্বয়ের অংশ নয়, বরং দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করছে। কারণ একদিকে তেল রপ্তানি থেকে বিপুল আয় বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করছে এবং ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে।
সৌদি আরবের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশটির তেল রপ্তানি আয় প্রায় ২৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই আয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তেল আয় বাড়লেও সৌদি সরকারের বাজেট ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে সরকারি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। ইরান সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কারণে সৌদি আরব সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরব এখন এক ধরনের দ্বৈত চাপের মধ্যে রয়েছে। একদিকে দেশটি তেলের উচ্চ আয়ের সুবিধা পাচ্ছে, অন্যদিকে ভিশন ২০৩০–এর অধীনে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর বিশাল ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সরকার এখন ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করছে।
ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ঘোষিত ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় সৌদি আরব গত কয়েক বছরে বিশ্বের অন্যতম বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে ভবিষ্যতনির্ভর শহর নয়েম আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পশ্চিমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবের অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ ব্যয়ের অনেক প্রকল্প এখন সংকুচিত করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। নয়েম প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও সৌদি প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলছে। ইরান–সংক্রান্ত অস্থিরতার কারণে এই নৌপথে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সৌদি আরব বিকল্প পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। দেশটির ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব যুদ্ধপূর্ব রপ্তানির বড় অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমে যাওয়াও রিয়াদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৌদি সরকারকে আরও হিসাবি হতে বাধ্য করছে।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সৌদি আরব এখন ধীরে ধীরে অর্থনীতির নতুন খাতগুলোর দিকে ঝুঁকছে। খনি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি এবং বিকল্প জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পশ্চিমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতা আগের তুলনায় কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি দেশটির পরিবর্তিত কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন বলেও মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তেলের বিপুল আয় থাকা সত্ত্বেও ব্যয় সংকোচন, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মাধ্যমে রিয়াদ ভবিষ্যতের জন্য নতুন হিসাব কষছে।