প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর মসলার বাজারে আবারও জমে উঠেছে ক্রেতাদের ভিড়। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা মসলার দোকানে কেনাকাটার চাপ স্পষ্টভাবে বেড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে এই ভিড়ের মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ মসলার দামে দেখা দিয়েছে ঊর্ধ্বগতি, যা সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই মসলার চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে কোরবানির মাংস সংরক্ষণ, রান্না এবং পারিবারিক আয়োজনকে ঘিরে এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, জিরা ও গোলমরিচের মতো পণ্যের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবারের বাজার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু মসলার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি। অনেকেই ঈদের আগেই প্রয়োজনীয় মসলা কিনে রাখছেন যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় ও দাম বৃদ্ধির চাপ এড়ানো যায়। ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রি বেড়েছে, তবে সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক থাকায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।
গত এক মাসের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু মসলার দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষ করে এলাচ ও লবঙ্গের দামে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, জিরার কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা, লবঙ্গে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং এলাচের কেজিতে প্রায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং আমদানি ব্যয়ের প্রভাবই মূলত এই বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে বাজারে আদা বিক্রি হচ্ছে কেজি ২০০ টাকায়, রসুন ১৫০ টাকায় এবং পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে এসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও অন্যান্য মসলার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কালিজিরা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭৫ টাকায়, জিরা ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়, গুঁড়া হলুদ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং গুঁড়া মরিচ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে এলাচ, যার মানভেদে কেজি ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। একইভাবে লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। দারুচিনি ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা এবং সাদা গোলমরিচ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঘি বিক্রি হচ্ছে কেজি ৩ হাজার ৪০০ টাকায় এবং তেজপাতা পাওয়া যাচ্ছে ১৮০ টাকায়।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মসলার সরবরাহ ও দামের অস্থিরতা বাংলাদেশের বাজারেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে এলাচ ও লবঙ্গ আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি স্থানীয় বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয়ও এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, দেশে মসলার সরবরাহ চেইন এখনো স্বাভাবিক রয়েছে এবং বড় কোনো সংকট নেই। শাহবুদ্দিন নামে কারওয়ান বাজারের এক মসলা ব্যবসায়ী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ে। তবে এবার সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকায় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়নি। কিছু পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের কারণে সামান্য বেড়েছে।
ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের দাম এখনো বেশি। তোফায়েল নামে এক ক্রেতা বলেন, সব মিলিয়ে বাজার খারাপ না, তবে এলাচ আর লবঙ্গ কিনতে গেলে এখনও একটু বেশি খরচ হচ্ছে। পরিমাণ কমাতে হচ্ছে।
আরেক ক্রেতা সাব্বির জানান, কোরবানির ঈদে রান্নার জন্য এই মসলাগুলো অপরিহার্য। কিন্তু দাম বেশি থাকায় হিসাব করে কিনতে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা থাকলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ এখনো রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের আগে শেষ মুহূর্তে বাজারে ভিড় আরও বাড়তে পারে, যা কিছু পণ্যের দামে সাময়িক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল থাকলে বড় ধরনের অস্থিরতার সম্ভাবনা কম। সরকারের বাজার নজরদারি ও আমদানি পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলেও তারা মত দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ঈদকে কেন্দ্র করে মসলার বাজারে যেমন চাহিদা বেড়েছে, তেমনি কিছু পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও বাজার এখনো পুরোপুরি অস্থিতিশীল হয়নি। তবে এলাচ ও লবঙ্গের মতো উচ্চমূল্যের মসলার দাম সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখনো কিছুটা চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।