প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারালেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৫)। ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে। জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো এই তরুণের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত জাহাঙ্গীর হোসাইন কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, একটি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে রাশিয়ায় নেওয়া হলেও পরে তাঁকে জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়। পরিবারের ভাষায়, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা।
স্থানীয় সূত্র ও পারিবারিক সদস্যরা জানান, প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে জাহাঙ্গীর একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় যান। শুরুতে তাঁকে একটি পিগ ফার্মে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে কাজ করার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে রেস্টুরেন্টে কাজের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রায় দুই মাস পর ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভয়াবহ ড্রোন হামলায় জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজন নিহত হন।
এই ঘটনায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মে রাশিয়া–নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলায় মোট চার বাংলাদেশি আক্রান্ত হন, যার মধ্যে তিনজন নিহত এবং একজন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান। ঘটনার সময় প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত না থাকলেও পরে সহকর্মীদের মাধ্যমে খবরটি নিশ্চিত করেন জাহাঙ্গীরের বন্ধু মৃদুল, যিনি রাশিয়ার একই সেনা ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। মৃদুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বিষয়টি জানান।
ভিডিও বার্তায় মৃদুল অভিযোগ করে বলেন, একটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েই তাঁরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, চাকরির নামে বিদেশে নেওয়ার পর অনেককে বিভিন্ন অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নিহত জাহাঙ্গীরের পরিবার এখন শোকে স্তব্ধ। পরিবারের সদস্যরা জানান, জাহাঙ্গীর ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। দুই বছর আগে তাঁর বাবা মারা যান। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব মূলত তাঁর কাঁধেই ছিল। বিদেশে গিয়ে পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করার আশা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে।
জাহাঙ্গীরের দুই বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে পরিবার। স্ত্রী ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। প্রতিবেশীরাও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। জয়কা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবির বলেন, জাহাঙ্গীরের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক একটি ঘটনা। তিনি বলেন, একটি তরুণ জীবিকার আশায় বিদেশে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারাবে—এটি কেউই মেনে নিতে পারছে না। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমরানুল কবির জানান, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে বিষয়টি যেহেতু বিদেশে সংঘটিত হয়েছে, তাই বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এদিকে, এর আগে একই এলাকায় আরও একজন বাংলাদেশি তরুণ ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত হন বলে জানা গেছে। ধারাবাহিকভাবে একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে বাংলাদেশ থেকে তরুণরা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যাচ্ছেন এবং কারা এর পেছনে জড়িত।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি মানব পাচার ও প্রতারণার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় ইস্যু। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নেওয়া এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনায় সরকারের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে যাতে কেউ প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য প্রবাসী শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
জাহাঙ্গীর হোসাইনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং একটি বড় সামাজিক প্রশ্নও সামনে এনেছে। স্বপ্নের কাজের খোঁজে বিদেশ যাত্রা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
গ্রামের আকাশে এখন শুধুই শোক। ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ, বিধবা স্ত্রীর কান্না আর বাবা হারানো পরিবারের অসহায়তা মিলিয়ে কান্দাইল বাগপাড়ার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। একসময় যে তরুণ পরিবারের স্বপ্ন ছিল, আজ তিনি হয়ে গেছেন একটি দুঃখগাঁথার নাম।