প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনব্যবস্থা নয়; বরং এটি সর্বকালের, সর্বযুগের এবং মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও চিরন্তন দিকনির্দেশনা—এমন মত তুলে ধরেছেন ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মানবসভ্যতার ইতিহাসে মানুষ নিজেই নানা আইন, মতবাদ ও শাসনব্যবস্থা তৈরি করেছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বারবার পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। কারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনশীল এবং স্বার্থের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ফলে মানব রচিত ব্যবস্থাগুলোতে স্থায়ী সমাধানের অভাব থেকে যায়।
অন্যদিকে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, পবিত্র কোরআনের বিধান মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে রয়েছে ন্যায়বিচার, ভারসাম্য, মানবিকতা এবং সমাজ পরিচালনার জন্য সার্বজনীন নির্দেশনা।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করলাম’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৩)। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই আয়াত ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা ও চূড়ান্ত জীবনব্যবস্থার স্বীকৃতি বহন করে।
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা তার লেখায় উল্লেখ করেন, আধুনিক বিশ্ব আজও ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ভারসাম্য এবং সামাজিক শান্তির জন্য নানা তত্ত্ব ও কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কিন্তু কোরআনের নীতিমালা দেড় হাজার বছর আগেই এসব মৌলিক বিষয়ের দিকনির্দেশনা দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানব প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জীবনব্যবস্থা। পারিবারিক স্থিতি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোরআনের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও আত্মীয়দের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে নিষেধ করেন।’ তার মতে, এই আয়াত ইসলামী সমাজব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ইসলামের অবস্থানকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত বলে দাবি করা হয়েছে লেখায়। সুদভিত্তিক অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বৈষম্যের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইসলাম সুদকে নিষিদ্ধ করে ন্যায়ভিত্তিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পথ দেখিয়েছে।
সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ তার মতে, এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং ও সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার ধারণা বিকশিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিকল্প মডেল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ছাড়া মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও ইসলামের অবস্থানকে যুগান্তকারী বলে উল্লেখ করা হয়। ইসলাম জাতি, বর্ণ বা ভাষার ভিত্তিতে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে না। সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাকওয়ার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।
ইসলামি ইতিহাসের বিদায় হজের ভাষণের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে লেখক বলেন, সেখানে মানবসমতার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক মানবাধিকার ধারণার বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এতে জাতিগত বৈষম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
লেখায় আরও বলা হয়, ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, অর্থনীতি এবং পারিবারিক জীবনের সব দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সুরা আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, কোরআনে মানবজীবনের কোনো মৌলিক দিক অবহেলিত হয়নি বলে ইসলামি ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া সুরা বনি ইসরাইলের ৯ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করে বলা হয়, কোরআন মানুষকে সর্বাধিক সরল ও কল্যাণময় পথের দিশা দেয়, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণকর।
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজার মতে, মানব রচিত আইন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হলেও কোরআনের মূলনীতি অপরিবর্তনীয় এবং চিরন্তন। তবে এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে যুগোপযোগী ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে, যা ইসলামী আইনকে সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক রাখে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, নবী মুহাম্মদ (সা.) কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা মুসলমানদের জন্য পথনির্দেশক নীতি হিসেবে কাজ করে আসছে।
সব মিলিয়ে লেখাটিতে ইসলামকে একটি সার্বজনীন, মানবিক এবং চিরন্তন জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে বলে মত প্রকাশ করা হয়।
লেখকের মতে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতা যতই অগ্রসর হোক না কেন, মানব প্রকৃতি ও নৈতিকতার মৌলিক চাহিদা অপরিবর্তিত থাকে। আর সেই চিরন্তন সত্যের ভিত্তিতেই ইসলাম সর্বকালের সর্বাধুনিক ও সর্বজনীন জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।