চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ, চলছে উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ, চলছে উদ্ধার

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের একটি কয়লা খনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত আটজন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর মাটির নিচে আটকা পড়েছেন আরও অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক। শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শতাধিক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, শানসি প্রদেশের চাংঝি শহরে অবস্থিত লিউশেনিউ কয়লা খনিতে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিস্ফোরণটি ঘটে। বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে প্রায় ২৪৭ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। আকস্মিক বিস্ফোরণের পর খনির ভেতরে ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। অনেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হলেও বহু শ্রমিক খনির গভীরে আটকা পড়ে যান।

শনিবার সকাল পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল অন্তত ২০০ জন শ্রমিককে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর খনির চারপাশে জরুরি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং সেখানে উদ্ধারকর্মী, দমকল বাহিনী ও চিকিৎসা সহায়তা দল মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও তা শোনা যায়। অনেক পরিবার রাতভর খনির বাইরে অবস্থান করে স্বজনদের খোঁজ জানতে অপেক্ষা করেছেন। নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের কান্না ও উৎকণ্ঠায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। উদ্ধার অভিযান চলাকালে খনির বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের অনেকেই সংবাদমাধ্যমের সামনে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান।

চীনের প্রেসিডেন্ট Xi Jinping দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতি থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছে বেইজিং।

চীনের অন্যতম প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত শানসি প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই খনি দুর্ঘটনার জন্য সমালোচিত। প্রদেশটির আয়তন ইউরোপের দেশ Greece-এর চেয়েও বড় এবং এখানে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। গত বছর শুধু এই প্রদেশ থেকেই প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে, যা চীনের মোট কয়লা উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প অর্থনীতির একটি হিসেবে চীনের বিদ্যুৎ ও ভারী শিল্প খাত এখনও ব্যাপকভাবে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শানসির মতো অঞ্চলে দিনরাত চলতে থাকে কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম। কিন্তু উৎপাদনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু খনিতে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয় না। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা ও গ্যাস পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

চীনে কয়লা খনিতে দুর্ঘটনা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দুই দশকে দেশটিতে হাজার হাজার শ্রমিক খনি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে গ্যাস বিস্ফোরণ, খনি ধস এবং বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, তবুও দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের দ্রুত শিল্পায়ন এবং জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে খনি খাতে অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ তৈরি হয়েছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান লাভ বাড়াতে গিয়ে নিরাপত্তা ব্যয় কমিয়ে দেয়। ফলে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রকৃত তথ্য গোপন করার প্রবণতাও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়।

এদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ালেও কয়লার ওপর নির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ায় খনি কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে লিউশেনিউ খনিতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারীরা বিশেষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খনির গভীরে আটকে পড়াদের সন্ধান করছেন। তবে বিষাক্ত গ্যাস এবং ধসে পড়া অংশের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই নিখোঁজ শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কয়লা শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উৎপাদনের প্রতিযোগিতার মধ্যে শ্রমিকদের জীবন কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে। নিহতদের পরিবারের শোক আর নিখোঁজদের স্বজনদের উৎকণ্ঠা যেন চীনের খনি শিল্পের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত