রাজবাড়ীতে গৃহকর বেড়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন নাগরিকরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
  • ৯ বার
রাজবাড়ীতে গৃহকর বেড়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন নাগরিকরা

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজবাড়ী পৌরসভায় হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে গৃহকর বৃদ্ধির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে। কেউ পাঁচ হাজার টাকা থেকে এক লাফে ৭৩ হাজার টাকা, কেউ ১২ হাজার টাকা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার বেশি করের নোটিশ পেয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে শহরজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকের অভিযোগ, নতুন কর নির্ধারণে বাস্তবতা ও নাগরিকদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন।

রাজবাড়ী শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমানের অভিজ্ঞতা যেন এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করার পর অবসরে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন তিনি। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে পৌরকরও পরিশোধ করেছেন। কিন্তু চলতি বছর পৌরসভার পক্ষ থেকে তার নামে ৭৩ হাজার টাকার কর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ গত পাঁচ বছর তিনি বছরে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা করে কর দিয়েছেন।

হঠাৎ এমন বিপুল কর বৃদ্ধির নোটিশ হাতে পেয়ে বিস্মিত ও হতাশ এই প্রবীণ নাগরিক বলেন, তিনি কখনও কল্পনাও করেননি কর এতটা বাড়তে পারে। তার তিনতলা বাড়িটি ২০২২ সালে নির্মাণ করা হলেও সেখানে মাত্র একটি পরিবার ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকে। অবসরের পর সীমিত আয়ে চলতে হয় তাকে। ফলে একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের কর পরিশোধ করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান নন, রাজবাড়ী পৌর এলাকার বহু নাগরিকই একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ও হোল্ডিং মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকের কর ১০ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কেউ নির্মাণাধীন বাড়ির জন্যও বিশাল অঙ্কের করের নোটিশ পেয়েছেন। এতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

রাজবাড়ী শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাংবাদিক লিটন চক্রবর্তী জানান, তার বাড়ির নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। অথচ পৌরসভা তার জন্য ৭৫ হাজার ৬০০ টাকা কর নির্ধারণ করেছে। একইভাবে তার ভাতিজা সাম্য চক্রবর্তীর বাড়িও এখনও নির্মাণাধীন। কিন্তু তার নামে কর নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৩৭৫ টাকা। তারা দুজনই বিষয়টিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।

সজ্জনকান্দা এলাকার বাসিন্দা মাশুক হেনার অভিযোগ আরও বিস্ময়কর। তিনি জানান, তার টিনের ঘর ছাড়া নতুন কোনো স্থাপনা নেই। আগে তিন হাজার টাকা কর দিতেন, তারও আগে দিতেন মাত্র ৮০০ টাকা। এবার তার কর নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার টাকা। এমন নোটিশ হাতে পেয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েছেন।

একই এলাকার বাসিন্দা কাজী মাহমুদা ইসলাম বলেন, তার পরিবারের মোট কর নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৫ টাকা। অথচ গতবার তারা কর দিয়েছিলেন মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জনগণের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে কীভাবে এমন কর নির্ধারণ করা হলো।

পৌর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, কর নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অতীতে মেয়র বা কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর কমিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল। ফলে একই ধরনের বাড়ির জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কম কর দিয়ে সুবিধা পেলেও সাধারণ নাগরিকরা চাপে পড়েছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর-১ শাখার বিধি অনুযায়ী আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের আয়তন, ভবনের ধরন এবং অবস্থান বিবেচনায় কর নির্ধারণ করার কথা রয়েছে। পাকা, আধাপাকা বা টিনশেড স্থাপনার জন্য আলাদা হার নির্ধারিত আছে। তবে নাগরিকদের অভিযোগ, বাস্তবে সেই নীতিমালা কতটা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজবাড়ী পৌরসভার কর শাখা সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে কর নির্ধারণ করা হয়—নির্মাণ ব্যয় ও সম্ভাব্য ভাড়ার ভিত্তিতে। পাঁচ বছর আগে প্রাথমিকভাবে যে কর নির্ধারণ করা হয়েছিল, অনেকেই আবেদন করে তা কমিয়ে এনেছিলেন। এবার নতুন করে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগের সেই প্রাথমিক খসড়ার হিসাব অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে করের পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে।

পৌর কর্তৃপক্ষের এমন ব্যাখ্যা নাগরিকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাদের দাবি, পাঁচ বছর আগের অস্বাভাবিক খসড়া করকে ভিত্তি করে নতুন কর নির্ধারণ করা এক ধরনের প্রশাসনিক বৈষম্য। এতে মানুষের ওপর অযাচিত চাপ তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে গত সোমবার রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফকির শাহাদত হোসেন বলেন, কর নির্ধারণ অবশ্যই জনস্বার্থ বিবেচনায় হতে হবে। মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখে কর পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। তিনি পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নাগরিকদের খোলামেলা আলোচনার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে রাজবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক বলেছেন, নতুন ভবন নির্মাণ হলে কর কিছুটা বাড়ে, এটি স্বাভাবিক। তবে বিষয়টি নিয়ে নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। যাদের আপত্তি রয়েছে, তারা আবেদন করলে আলোচনা করে কর সমন্বয় করা হবে।

রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আশিক উন নবী তালুকদারও বলেছেন, পৌর আইনের বিধান অনুসরণ করেই কর নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়ির আয়তন, অবস্থান ও আর্থিক দিক বিবেচনায় এনে প্রাথমিকভাবে কর ধার্য করা হয়েছে। তবে এটিই চূড়ান্ত নয় এবং নাগরিকদের বক্তব্য শুনে প্রয়োজন হলে সংশোধন করা হবে।

তবে নাগরিকদের প্রশ্ন, যদি কর নির্ধারণই চূড়ান্ত না হয়, তাহলে এত বড় অঙ্কের করের নোটিশ দিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করা হলো কেন? মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয় এবং জীবনযাত্রার বাড়তি খরচে চাপে রয়েছে। তার ওপর হঠাৎ কয়েক গুণ কর বৃদ্ধির ঘটনায় অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

রাজবাড়ীর এই ঘটনা শুধু একটি পৌরসভার কর বিতর্ক নয়, বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনসম্পৃক্ততার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। নাগরিকদের আশা, প্রশাসন দ্রুত বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোবে এবং জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে ন্যায়সঙ্গত কর কাঠামো নিশ্চিত করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত