প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ফুটবলের দীর্ঘদিনের হতাশা, ব্যর্থতা আর অপূর্ণ প্রত্যাশার মাঝখানে নতুন এক আশার নাম হয়ে এসেছেন Thomas Dooley। জার্মান বংশোদ্ভূত সাবেক মার্কিন অধিনায়ককে জাতীয় দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে Bangladesh Football Federation। দুই বছরের চুক্তিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুক্রবার সকালে ঢাকায় পা রেখেই নিজের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ফুটবলকে ধীরে ধীরে বদলে দিয়ে আগামী এক বছরের মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৫০-১৬০ এর মধ্যে নিয়ে যেতে চান অভিজ্ঞ এই কোচ।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের বড় অভিযোগ ছিল জাতীয় দলে পরিকল্পনার অভাব, ধারাবাহিকতার সংকট এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলার অক্ষমতা। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের নিচের সারিতে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় নতুন কোচ হিসেবে থমাস ডুলির আগমনকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে স্বপ্ন জাগতে শুরু করেছে।
ঢাকায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিএসপির স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন ডুলি। সেখানে তিনি বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে নিজের দর্শন তুলে ধরেন। তার কথাবার্তায় ছিল আত্মবিশ্বাস, বাস্তববাদিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, রাতারাতি কোনো অলৌকিক পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে উন্নতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে।
থমাস ডুলি বলেন, এশিয়ার ফুটবলের প্রতি তার আলাদা ভালোবাসা রয়েছে। এশিয়ান সংস্কৃতি, এখানকার মানুষের আবেগ এবং ফুটবলকে ঘিরে সমর্থকদের উন্মাদনা তাকে বারবার এই অঞ্চলে টেনে আনে। এর আগেও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করেছে।
সাবেক মার্কিন অধিনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ডুলির পরিচিতি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি United States men’s national soccer team-এর হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং নেতৃত্বও দিয়েছেন। পরবর্তীতে কোচিং ক্যারিয়ারেও তিনি বিভিন্ন জাতীয় দল ও ক্লাবে কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে Guyana national football team-এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তবে বাংলাদেশের ফুটবলের সম্ভাবনা এবং এশিয়ায় কাজ করার আগ্রহ থেকেই নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশ দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে ডুলি খুব বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক বড়, তবে সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে এগোতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনার বিষয়টিও ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তিনি। তার ভাষায়, “বাংলাদেশে হয়তো আমার মতো লাখ লাখ কোচ আছেন। সবাই ফুটবল বোঝেন, মতামত দেন। এটা ভালো, কারণ ফুটবল নিয়ে মানুষের আবেগ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।”
তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তব পরিকল্পনাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন এই কোচ। তার মতে, ছোট ছোট অর্জনের মধ্য দিয়েই বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়। তাই শুরুতেই অবাস্তব প্রতিশ্রুতি না দিয়ে তিনি ধাপে ধাপে দলকে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের ফুটবলে টেকনিক্যাল উন্নয়ন, ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং দলগত বোঝাপড়ার ওপর জোর দিতে চান তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় দলে তরুণ এবং প্রবাসী ফুটবলারদের সমন্বয়ে নতুন এক কাঠামো তৈরি হচ্ছে। হামজা, শমিতসহ বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে ঘিরে সমর্থকদের আগ্রহ বাড়ছে। ডুলিও এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চান। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলন এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের ফুটবলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
বাংলাদেশ ফুটবলের অতীত ব্যর্থতাও সামনে এনেছেন নতুন কোচ। গত দুই দশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য না পাওয়ার হতাশা রয়েছে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতাগুলোতেও ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি দল। ডুলি মনে করেন, এখন সময় এসেছে সেই ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, থমাস ডুলির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে মানসিক সংযোগ গড়ে তোলার সক্ষমতা। আধুনিক ফুটবলে শুধু কৌশল নয়, খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ফুটবলারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ডুলি সেই জায়গায় পরিবর্তন আনতে পারেন বলেই মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভালো ফল করতে না পারলে র্যাঙ্কিং উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে দেশের ঘরোয়া ফুটবল কাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ জাতীয় দলের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয় স্থানীয় লিগ ও একাডেমি থেকে। ডুলিও এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। তাই শুধু জাতীয় দল নয়, সামগ্রিক ফুটবল সংস্কৃতির উন্নয়ন নিয়েও ভাবছেন তিনি।
আগামী ৫ জুন সান মারিনোর বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশ দলের দায়িত্বে প্রথমবার মাঠে নামবেন থমাস ডুলি। সেই ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে নতুন এক অধ্যায়। সমর্থকদের প্রত্যাশা এখন আকাশছোঁয়া। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে বাংলাদেশের ফুটবল আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কি না, তার প্রথম উত্তর মিলতে শুরু করবে ডুলির অধীনে আসন্ন ম্যাচগুলোতেই।
নতুন কোচের আগমনে বাংলাদেশের ফুটবলে যে নতুন আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, এই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন থমাস ডুলি। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশ ফুটবল আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।