হাবিবসহ ৫ জনের মামলার রায় ২৮ জুন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলি করা এবং দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামী ২৮ জুন। এ মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মোট পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ আদেশ দেন। মামলাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অন্যতম আলোচিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। সেই কারণে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর আইনি অঙ্গন ও জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর রামপুরায় আন্দোলনের সময় এক তরুণ ভবনের কার্নিশে ঝুলে ছিলেন। সেই অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। এই দৃশ্য তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। একই ঘটনায় আরও দুজনকে হত্যার অভিযোগও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ঘটনাটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও পরিকল্পিত দমননীতির অংশ।

এ মামলার আসামিরা হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান, একই থানার সাবেক উপপরিদর্শক তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক চঞ্চল চন্দ্র সরকার। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে চারজন পলাতক। একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকার কারাগারে আছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারাধীন ছিল দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, আন্দোলন দমন করতে সাধারণ মানুষ ও নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর এমনভাবে গুলি চালানো হয়েছিল, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।

এই মামলার গুরুত্ব শুধু পাঁচ আসামিকে ঘিরে নয়। এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচারিক মূল্যায়নের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৪ সালের সেই আন্দোলনে বহু মানুষ হতাহত হন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওই সময়টি এখনো তীব্র আবেগ, ক্ষোভ ও বিতর্কের বিষয়। অনেক পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে। অনেকেই আহত হয়েছেন। আবার অনেক ঘটনার ভিডিও, ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান জনমনে গভীর দাগ রেখে গেছে।

রামপুরার কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করার অভিযোগ সেই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি। একজন মানুষ জীবন বাঁচাতে ভবনের কার্নিশে আশ্রয় নিয়েছেন, আর সেই অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে, এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি করেছিল। ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার এবং জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবেও সামনে আসে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ প্রমাণের মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত দেখবে, অভিযুক্তদের ভূমিকা কী ছিল, তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না, আদেশ বা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক ছিল কি না, এবং ঘটনাগুলো বৃহত্তর আক্রমণ বা দমননীতির অংশ ছিল কি না। তাই রায়ের আগে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান একসময় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন। তাই তার নাম এই মামলায় আসা বিষয়টিকে আরও আলোচিত করেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায় কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, সে প্রশ্নও এই মামলার মাধ্যমে সামনে এসেছে। কোনো ঘটনার সরাসরি দায়, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং অধীনস্থ বাহিনীর আচরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভূমিকা আদালত কীভাবে বিবেচনা করেন, সেটি রায়ে স্পষ্ট হতে পারে।

এ মামলায় চার আসামি পলাতক থাকায় বিচারিক প্রক্রিয়ার আরেকটি দিক সামনে এসেছে। পলাতক আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার চললেও আদালতকে আইনের সব নিয়ম মেনে এগোতে হয়। তাদের পক্ষে আইনগত প্রতিনিধিত্ব, নোটিশ, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্কের বিষয়গুলো বিচারিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে গ্রেপ্তার আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে আদালতে আইনজীবীরা শুনানি করেছেন।

ভুক্তভোগী পরিবার ও আন্দোলনে আহতদের জন্য এই রায়ের তারিখ একটি বড় মুহূর্ত। অনেকেই মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার বিচার না হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না। আবার বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রমাণনির্ভর। কারণ বিচার রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভাষায় নয়, আইনের ভাষায় হতে হয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ট্রাইব্যুনালের বড় দায়িত্ব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রায়ের তারিখ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, এটি জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের জন্য ন্যায়বিচারের পথে বড় ধাপ। কেউ আবার বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নজর রাখার কথা বলছেন। এমন সংবেদনশীল মামলায় জনমত প্রবল থাকে। তবে শেষ সিদ্ধান্ত আদালতের। আদালত সাক্ষ্য, নথি, যুক্তি ও আইনের ভিত্তিতেই রায় দেবেন।

আগামী ২৮ জুন ঘোষিত রায় তাই শুধু একটি মামলার পরিণতি নয়। এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। রায়ে আদালত কী বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়, এবং ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায় কি না, সেদিকে এখন সবার নজর।

সব মিলিয়ে রামপুরার কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করা এবং দুজনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলা দেশের আইন-আদালত ও রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। রায়ের দিন ধার্য হওয়ার মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে পৌঁছেছে। তবে রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত সব আসামি আইনের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত, দোষী নন। আদালতের রায়ই নির্ধারণ করবে, এই গুরুতর অভিযোগের আইনি পরিণতি কী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত