জিপিএ-৫ নয়, সৃজনশীল শিক্ষার আহ্বান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
  • ২৯ বার

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শিক্ষার্থীদের শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় না ছুটে সৃজনশীল, আনন্দময় ও মানবিক শিক্ষায় বড় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, আগামী দিনের প্রজন্ম যেন শুধু জিপিএ-৫ নামের সোনার হরিণের পেছনে না দৌড়ায়। তারা যেন চিন্তা করতে শেখে। তারা যেন খেলতে খেলতে শেখে। তারা যেন বইয়ের বাইরে জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি ও দক্ষতার শিক্ষা পায়।

সোমবার রাজধানীর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ খেলার মাঠে প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। শিশুদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, সৃজনশীলতা ও আনন্দময় শেখার পরিবেশ নিয়ে তিনি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার লক্ষ্য শুধু পরীক্ষার ফল নয়। একজন শিক্ষার্থী ভালো মানুষ হবে, নিজের কথা বলতে পারবে, দলগতভাবে কাজ করতে শিখবে, শরীর ও মন সুস্থ রাখবে, সমাজকে বুঝবে, সেটিও শিক্ষার বড় অংশ। তার মতে, শুধু নম্বরকেন্দ্রিক শিক্ষা শিশুদের কৌতূহল কমিয়ে দেয়। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও আনন্দময় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা দরকার।

তিনি বলেন, আমরা চাই না আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শুধু জিপিএ-৫-এর পেছনে ছুটে বেড়াক। তারা ক্রিয়েটিভ হোক, সৃজনশীল হোক। একই সঙ্গে খেলতে খেলতে শিখুক। শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা, নম্বর, কোচিং, মুখস্থবিদ্যা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। অনেক অভিভাবক এখনো সন্তানের শিক্ষা বলতে ভালো ফলাফলকেই প্রধান মানদণ্ড মনে করেন। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের জন্য দরকার দক্ষতা, চিন্তা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং মানসিক দৃঢ়তা।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, আনন্দময় শিক্ষার জন্য মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন শিক্ষক তার ক্লাসের শিক্ষার্থীদের তথ্য আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন। শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শারীরিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা, পারিবারিক প্রেক্ষাপট এবং শেখার অগ্রগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এরপর শিক্ষক তার ট্যাব ব্যবহার করে ক্লাসে আরও সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে পাঠদান করতে পারবেন।

তার মতে, প্রযুক্তি শুধু ডিভাইস দেওয়ার বিষয় নয়। প্রযুক্তি তখনই কাজে লাগে, যখন তা শিশুর শেখাকে সহজ করে। একটি ট্যাব, একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম বা একটি ডিজিটাল কনটেন্ট তখনই সফল হবে, যখন শিক্ষক তা দিয়ে শিশুদের বুঝতে সাহায্য করবেন। তিনি বলেন, আনন্দময় শিক্ষা মানে শিশু যেন ভয় না পায়। শিশু যেন প্রশ্ন করতে পারে। শিশু যেন শেখাকে চাপ নয়, আগ্রহ হিসেবে দেখে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালুর কথাও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, মিড ডে মিল শুরু হয়েছে। আগামী প্রাথমিক স্কুলের বাজেটেও এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের অনেক শিশুর জন্য স্কুলের খাবার শুধু পুষ্টির বিষয় নয়। এটি স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষায় ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকার শিশুদের জন্য মিড ডে মিল বড় সহায়তা হতে পারে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিশুদের শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও বিতর্ক শিক্ষাকে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও বিতর্ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক ধারণা যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই নিজের আগ্রহ, দক্ষতা ও চিন্তার জায়গা খুঁজে পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। খেলাধুলা শিশুদের শারীরিকভাবে শক্তিশালী করে। সংস্কৃতি তাদের প্রকাশভঙ্গি ও সংবেদনশীলতা বাড়ায়। বিতর্ক তাদের যুক্তি, ভাষা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। আর কারিগরি শিক্ষা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে বই, পরীক্ষা ও সনদের বাইরে নিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি।

প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর মতো আয়োজনের লক্ষ্যও সেই দিকেই। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই পদক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সৃজনশীল অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। তাই এই প্রতিযোগিতা শুধু পুরস্কারের আয়োজন নয়। এটি শিশুদের আত্মবিশ্বাস, অংশগ্রহণ ও মেধা প্রকাশের ক্ষেত্রও তৈরি করে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগে শিক্ষা খাতে জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ ছিল, যা প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এবার তা বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ করা হয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে বরাদ্দ বাড়লেই শিক্ষা বদলে যায় না। শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, বরাদ্দের সঙ্গে দরকার সঠিক ব্যয়, জবাবদিহি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্কুল অবকাঠামো, মানসম্মত পাঠ্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ের নজরদারি। অনেক স্কুলে এখনো শিক্ষক সংকট আছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষ কম। কোথাও খেলার মাঠ নেই। কোথাও ডিজিটাল সরঞ্জাম থাকলেও তা ব্যবহার করার মতো প্রশিক্ষণ নেই। তাই বড় বরাদ্দকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হলে মাঠপর্যায়ে কাজ বাড়াতে হবে।

কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন নিয়েও শিক্ষামন্ত্রী কথা বলেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে ৫৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া সারাদেশে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপনের কাজ চলছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এসব কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তার মতে, দেশের শিক্ষার্থীদের শুধু সাধারণ ডিগ্রির দিকে ঠেলে দিলে হবে না। তাদের হাতে কাজের দক্ষতা দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের চাকরি ও কর্মসংস্থান দক্ষতানির্ভর হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। প্রতি বছর লাখো তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে আসে। কিন্তু অনেকের হাতে ব্যবহারিক দক্ষতা থাকে না। ফলে ডিগ্রি থাকলেও কাজ পাওয়া কঠিন হয়। কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, ভাষা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা বাড়ানো গেলে তরুণরা শুধু চাকরি খুঁজবে না, কাজও তৈরি করতে পারবে।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক অবস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে। ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগে শিক্ষার্থীর মানসিক ও পারিবারিক অবস্থার তথ্য রাখার কথা তিনি বলেছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিশুর শেখা শুধু বইয়ের ওপর নির্ভর করে না। তার ঘরের পরিবেশ, পুষ্টি, নিরাপত্তা, মানসিক চাপ, পরিবারে সহিংসতা বা দারিদ্র্যও শেখার ওপর প্রভাব ফেলে। শিক্ষক যদি শিশুর বাস্তব অবস্থা বুঝতে পারেন, তাহলে তিনি আরও মানবিকভাবে সহায়তা করতে পারবেন।

তবে এ ক্ষেত্রে শিশুদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করাও জরুরি। শিক্ষার্থীর পারিবারিক, শারীরিক বা মানসিক তথ্য সংরক্ষণ হলে তা নিরাপদভাবে ব্যবহারের নিয়ম থাকতে হবে। এসব তথ্য যেন কোনো শিশুকে আলাদা করে অপমান, বৈষম্য বা চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহার না হয়, সেদিকে শিক্ষা প্রশাসনের সতর্ক থাকা দরকার।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল পরিষ্কার। শিক্ষাকে নম্বরের দৌড় থেকে বের করে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিশু যেন আনন্দ নিয়ে স্কুলে আসে। যেন খেলতে পারে, গান গাইতে পারে, বিতর্ক করতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, নিজের প্রশ্ন করতে পারে। তাহলেই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে মানুষ গড়ার শক্তি পাবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে আছে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার চাপ। অন্যদিকে আছে ঝরে পড়া, শিক্ষাবৈষম্য, শিক্ষক সংকট, প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার দূরত্ব। এই বাস্তবতায় শিক্ষামন্ত্রীর সৃজনশীল শিক্ষার আহ্বান গুরুত্বপূর্ণ। তবে মানুষের আশা, এই আহ্বান যেন শুধু অনুষ্ঠানের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি যেন প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি ক্লাসরুম এবং প্রতিটি শিশুর জীবনে পৌঁছায়।

শেষ পর্যন্ত জিপিএ-৫ একটি ফলাফল। কিন্তু সৃজনশীলতা, মানবিকতা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য সেই বড় সত্যটিই আবার সামনে আনল। এখন দরকার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। কারণ দেশের আগামী দিনের শক্তি শুধু সনদধারী শিক্ষার্থী নয়, চিন্তাশীল, দক্ষ ও সৃজনশীল মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত