প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নোয়াখালী-৬, হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের নির্বাচনি হলফনামা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি নেতা রাশেদ খান দাবি করেছেন, হান্নান মাসউদ নিজের হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন। এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে রাশেদ খান এ প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে হান্নান মাসউদ নিজেই হলফনামায় অসত্য তথ্য উল্লেখ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। রাশেদের ভাষ্য অনুযায়ী, হান্নান মাসউদ বলেছেন, ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আয়কর রিটার্ন জমা দিতে সুবিধা হবে বলে আইনজীবীর পরামর্শে হলফনামায় কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তার কোনো স্থাবর সম্পদ নেই।
রাশেদ খান বলছেন, এই বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে নির্বাচনি হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সঙ্গে হান্নান মাসউদের বর্তমান বক্তব্যের অসঙ্গতি তৈরি হয়। তার প্রশ্ন, একজন সংসদ সদস্য যদি নিজেই স্বীকার করেন যে হলফনামায় দেওয়া তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, তাহলে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও জানতে চান, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার এমপি পদ বাতিল হবে কি না।
নির্বাচনি হলফনামা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ নয়। এটি ভোটারের কাছে একজন প্রার্থীর আর্থিক, আইনি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। প্রার্থী তার আয়, সম্পদ, দায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মামলা, পেশা ও অন্যান্য তথ্য সেখানে উল্লেখ করেন। ভোটাররা সেই তথ্য দেখে প্রার্থীর সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। তাই হলফনামায় ভুল বা অসত্য তথ্য দেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করে।
ফেসবুক পোস্টে রাশেদ খান নির্বাচন কমিশনের একটি বক্তব্যও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কোনো প্রার্থী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে ভোটের পরেও নির্বাচন কমিশন তদন্ত করতে পারবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পাশাপাশি সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিধানও রয়েছে। রাশেদ এই বক্তব্য সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন, এখন নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নেবে।
হান্নান মাসউদ বর্তমানে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবেও পরিচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় রাজনীতিতে যে নতুন প্রজন্মের কয়েকজন মুখ আলোচনায় আসে, তাদের মধ্যে তিনি একজন। তার রাজনৈতিক উত্থান, নির্বাচনি সাফল্য এবং বিভিন্ন বিতর্ক আগেও আলোচনায় এসেছে। এবার হলফনামা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
রাশেদ খান তার পোস্টে আরও বলেন, অতীতে তিনি হান্নান মাসউদ সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের একটি পথ হতে পারে তার নির্বাচনি হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করা। তার দাবি, হান্নান মাসউদের সাম্প্রতিক কয়েকটি বক্তব্য ও হলফনামায় দেওয়া তথ্যের মধ্যে মিল আছে কি না, সেটি যাচাই করা দরকার। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে হান্নান মাসউদ দাবি করেছিলেন, স্ত্রীর সেমিস্টার ফি দিতে তাকে একজন পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হয়েছে। নতুন বাড়ির জন্য ইট কেনার পরও কয়েক লাখ টাকা বাকি রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। রাশেদের প্রশ্ন, এসব বক্তব্যের সঙ্গে হলফনামার তথ্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুত আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ নির্বাচনি হলফনামা নিয়ে আগে বিভিন্ন সময় বিতর্ক হয়েছে। প্রার্থীরা সম্পদ কম দেখিয়েছেন, আয়ের উৎস অস্পষ্ট রেখেছেন, ঋণ বা মামলার তথ্য গোপন করেছেন, এমন অভিযোগও অতীতে উঠেছে। তবে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয় না। নির্বাচন কমিশন, আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হলফনামায় মিথ্যা তথ্যের অভিযোগ গুরুতর। কিন্তু এটি প্রমাণের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রথমে দেখতে হয়, হলফনামায় কী লেখা আছে। এরপর যাচাই করতে হয়, সেই তথ্যের বিপরীতে সরকারি নথি, আয়কর রিটার্ন, সম্পত্তির দলিল, ব্যাংক হিসাব বা অন্য কোনো প্রমাণ কী বলছে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
অন্যদিকে একজন সংসদ সদস্যের পদ বাতিলের বিষয়টি আরও জটিল। নির্বাচন কমিশনের তদন্ত, আইনি ব্যাখ্যা, প্রমাণ, শুনানি এবং প্রয়োজন হলে আদালতের সিদ্ধান্ত, সবকিছু এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাই হান্নান মাসউদের এমপি পদ বাতিল হচ্ছে, এমন দাবি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং বিষয়টি এখন অভিযোগ, প্রশ্ন এবং সম্ভাব্য তদন্তের পর্যায়ে আছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম রাশেদ খানের অভিযোগের বিষয়ে হান্নান মাসউদের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেসবুকের ওই পোস্ট তিনি দেখেননি। পোস্ট না দেখে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। তার এই সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, অভিযোগের বিষয়ে তিনি এখনো বিস্তারিত জবাব দেননি। তাই তার পূর্ণ অবস্থান জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
রাজনৈতিকভাবে এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি শুধু এক সংসদ সদস্যের সম্পদ বা হলফনামা নিয়ে নয়। এটি নির্বাচনি স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং নতুন প্রজন্মের নেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে যারা পরিবর্তন, জবাবদিহি ও সততার কথা বলেছেন, তাদের ওপর জনগণের প্রত্যাশা বেশি। ফলে তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দ্রুত জনআলোচনায় আসে।
রাশেদ খান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি আগে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দেন। তার রাজনৈতিক অবস্থানও এই অভিযোগকে দলীয় বিতর্কের রং দিয়েছে। তাই অনেকে বিষয়টিকে রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও হলফনামার তথ্য যাচাই করা জনস্বার্থের বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট প্রকাশের পর নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন, নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি তদন্ত করতে হবে। কেউ বলছেন, রাজনৈতিক অভিযোগ দিয়ে কাউকে দোষী বানানো ঠিক নয়। আবার কেউ মনে করছেন, জননেতাদের আর্থিক তথ্য জনগণের সামনে পরিষ্কার থাকা উচিত। এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, হলফনামা এখন শুধু নির্বাচন কমিশনের কাগজ নয়, জনগণের নজরদারির বিষয়ও।
বাংলাদেশে নির্বাচনি হলফনামা ব্যবস্থা চালুর মূল লক্ষ্য ছিল ভোটারকে তথ্য দেওয়া। ভোটার যেন প্রার্থীর সম্পদ, দায়, মামলা ও পেশাগত অবস্থান জানতে পারেন। কিন্তু সেই তথ্য যদি ভুল হয় বা ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে দেওয়া হয়, তাহলে ভোটারের জানার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগটি যদি ভিত্তিহীন হয়, তবে সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ ভুল অভিযোগও একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন নিরপেক্ষ যাচাই। নির্বাচন কমিশন চাইলে হলফনামার তথ্য, আয়কর নথি, সম্পত্তির দলিল এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য মিলিয়ে দেখতে পারে। একই সঙ্গে হান্নান মাসউদ নিজেও চাইলে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। এতে বিতর্ক কমবে। জনগণও পরিষ্কার ধারণা পাবে।
সব মিলিয়ে হান্নান মাসউদের হলফনামা নিয়ে রাশেদ খানের প্রশ্ন নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। অভিযোগটি প্রমাণিত হলে এর আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব বড় হতে পারে। তবে এখনো বিষয়টি তদন্ত বা সিদ্ধান্তের পর্যায়ে যায়নি। তাই দায়িত্বশীল অবস্থান হলো, অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা। আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা। কারণ সংসদ সদস্য পদ বাতিলের মতো গুরুতর বিষয় কেবল আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে পারে।