চীনের চাপের মুখে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে তাইওয়ান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাইওয়ানের আকাশসীমার কাছাকাছি চীনের একাধিক যুদ্ধবিমানের সক্রিয় উপস্থিতির পরপরই পাঁচ দিনব্যাপী বৃহৎ যুদ্ধ প্রস্তুতি মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে তাইওয়ান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং ও তাইপের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও এবার পরিস্থিতি নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং তার জবাবে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শুধু দুই পক্ষের মধ্যকার বিরোধকেই সামনে আনছে না, বরং সমগ্র পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।

রোববার (২১ জুন) তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে সোমবার থেকে শুরু হবে ‘ইমিডিয়েট কমব্যাট রেডিনেস এক্সারসাইজ’ বা তাৎক্ষণিক যুদ্ধ প্রস্তুতি মহড়া। আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চলা এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে দেশটির সামরিক বাহিনীর বার্ষিক যৌথ অভিযান প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বিবেচনায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বিত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করাই এই মহড়ার প্রধান উদ্দেশ্য।

তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল। ফলে কেবল তাত্ত্বিক অনুশীলন নয়, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিবেশ তৈরি করে সৈন্যদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন। মহড়ার সময় সেনা সদস্যদের দ্রুত মোতায়েন, কমান্ড ব্যবস্থার কার্যকারিতা, যৌথ অভিযান পরিচালনা, রসদ সরবরাহ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হবে।

এই ঘোষণার মাত্র একদিন আগে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, চীনের ২১টি সামরিক বিমান দ্বীপটির আশপাশের আকাশসীমায় সক্রিয় ছিল। এসব বিমানের মধ্যে অত্যাধুনিক জে-১৬ যুদ্ধবিমান, কেজে-৫০০ আকাশ সতর্কীকরণ বিমান এবং ওয়াই-২০ আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও ছিল। তাইওয়ানের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৯টি বিমান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। বেইজিংয়ের অবস্থান হলো, প্রয়োজন হলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেও দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করা হবে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের একটি কার্যত স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনা করছে। দেশটির সরকার বারবার বলেছে, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র তাইওয়ানের জনগণের।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সামরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই চীনা যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ তাইওয়ানের আশপাশে টহল দিচ্ছে। বেইজিং এটিকে নিয়মিত সামরিক কার্যক্রম বলে উল্লেখ করলেও তাইপে মনে করে, এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন মহড়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থা থেকে যুদ্ধকালীন অবস্থায় দ্রুত রূপান্তরের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা কৌশল বাস্তবায়নের দক্ষতাও মূল্যায়ন করা হবে। আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাও এই প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও চীন উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। চলতি মাসের শুরুতে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা উন্নত ‘হিমার্স’ রকেট সিস্টেমের পরীক্ষা চালায়। এই অস্ত্রব্যবস্থা দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতা রাখে এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চীন বরাবরই এ ধরনের সামরিক সহযোগিতার বিরোধিতা করে আসছে।

আগামী আগস্টে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘হান কুয়াং’ নিয়েও ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। প্রতিবারের মতো এবারও সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসন মোকাবিলার বিভিন্ন কৌশল সেখানে অনুশীলন করা হবে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান মহড়া মূলত সেই বৃহৎ আয়োজনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করবে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাইওয়ান প্রণালি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের বৃহৎ প্রযুক্তি শিল্পের একটি বড় অংশ তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়বে।

তাইওয়ানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি হিসেবে দেখলেও বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া আসে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে চীন প্রায়ই তাইওয়ানের সামরিক মহড়ার জবাবে নিজস্ব সামরিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে চীনা যুদ্ধবিমানের অনুপ্রবেশের পর তাইওয়ানের যুদ্ধ প্রস্তুতি মহড়ার ঘোষণা পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। দুই পক্ষের অবস্থান এখনো কঠোর থাকলেও সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সংলাপের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত