প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের শত শত কোটি রুপির ব্যাংক হিসাব ঘিরে উদ্ভূত বিতর্ক। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কার পর দলটির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকট, সাংগঠনিক বিভাজন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই প্রকট হচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এবার প্রায় ৪৪০ কোটি রুপি জমা থাকা তিনটি ব্যাংক হিসাবের ডেবিট কার্যক্রম স্থগিত করার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উদ্যোগে একটি বেসরকারি ব্যাংকে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি হিসাবের ওপর ‘ডেবিট ফ্রিজ’ আরোপ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোতে নতুন অর্থ জমা করা গেলেও সেখান থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাবে না। রাজনৈতিক মহলে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এটি সরাসরি দলটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তহবিলের উৎস নিয়ে চলমান বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত।
তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল দলটির ভেতরে অসন্তোষ ও মতবিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে কয়েকজন বিদ্রোহী বিধায়ক ও নেতার পক্ষ থেকে দলীয় তহবিলের উৎস, ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।
জানা গেছে, তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ১০ জন বিধায়ক পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তারা দলীয় হিসাবগুলোতে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন যে এসব অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে নাকি কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, কথিত ‘কাট-মানি’ আদায়, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, বিভিন্ন প্রকল্পের অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া দলীয় হিসাব পরিচালনা করা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযোগে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয় যাচাই করার জন্য আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা অর্থের উৎস, জমা ও উত্তোলনের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করবেন বলে জানা গেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। দলটির একাংশ মনে করছে, নির্বাচনের পর সংগঠন পুনর্গঠনের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী নেতারা বলছেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া দলের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা অরূপ বিশ্বাসের ভূমিকা। কয়েকদিন আগে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে দলীয় হিসাবগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সব ধরনের আর্থিক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। তার বক্তব্য ছিল, নেতৃত্বসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শত শত কোটি রুপির তহবিল পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে অরূপ বিশ্বাসের এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছে দলটির আরেকটি অংশ। তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে বলেছেন, অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে দলের কোষাধ্যক্ষ নন এবং আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সাংগঠনিক ক্ষমতাও তার নেই। তিনি দাবি করেন, গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শুভাশিস চক্রবর্তীকে নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দলীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়ে তিনিই এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনা শুধু একটি আর্থিক তদন্তের বিষয় নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভেতরে চলমান ক্ষমতার দ্বন্দ্বেরও প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলটির বিভিন্ন স্তরে যে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেসব গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্যের লড়াই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই তদন্তের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। যদি অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং বিরোধী দলগুলোর জন্যও নতুন রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করবে। অন্যদিকে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দলীয় তহবিল নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সংগঠনের ঐক্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তৃণমূল নেতৃত্ব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অবস্থান জানায়নি। তবে রাজনৈতিক মহল মনে করছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দলকে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৪৪০ কোটি রুপির ব্যাংক হিসাব জব্দের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তদন্তের অগ্রগতি এবং দলীয় নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যু রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।