ফোন থেকে ঘর—এআই বিপ্লবে বড় বাজি আম্বানির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিস্তার নতুন গতি পাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন এআইকে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন ভারতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজও বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি ঘোষণা দিয়েছেন, ফোন কল থেকে শুরু করে মোবাইল অ্যাপ, ব্যক্তিগত সহকারী এবং ঘরের বিভিন্ন স্মার্ট ডিভাইস পর্যন্ত এআই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া হবে। তার এই ঘোষণাকে ভারতের প্রযুক্তি খাতে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

রিলায়েন্সের সাম্প্রতিক বার্ষিক সাধারণ সভায় একাধিক নতুন এআইভিত্তিক সেবা ও প্রযুক্তি উন্মোচন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ানো নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ, দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয় করে তোলা। বিশেষ করে ভারতের বিশাল টেলিকম গ্রাহকভিত্তিকে কেন্দ্র করে রিলায়েন্স যে কৌশল নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নতুন ঘোষিত সেবাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘জিও কল এজেন্ট’। এটি মূলত একটি এআই সহকারী, যা সরাসরি ফোন কলে যুক্ত হয়ে ব্যবহারকারীর কথোপকথন বিশ্লেষণ করতে পারবে। শুধু কথোপকথন লিখে রাখা বা সারাংশ তৈরিই নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতাও থাকবে এতে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, একজন ব্যবহারকারী ফোনে নির্দেশ দিলেই এআই ট্যাক্সি বুক করতে পারবে, খাবার অর্ডার দিতে পারবে কিংবা বিভিন্ন ধরনের সেবা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করতে পারবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রচলিত ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের চেয়ে আরও উন্নত একটি ধারণা। কারণ অধিকাংশ বর্তমান এআই সহকারী আলাদা অ্যাপ বা ডিভাইসনির্ভর হলেও জিওর নতুন সেবা সরাসরি টেলিকম নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে ব্যবহারকারীকে আলাদা কোনো সফটওয়্যার চালু করার প্রয়োজন হবে না। ফোন ব্যবহারের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই এআই সহকারী কাজ করবে।

রিলায়েন্স জানিয়েছে, তাদের ৫০ কোটিরও বেশি গ্রাহকের জন্য চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। যদি পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এআইভিত্তিক টেলিকম সেবা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এদিকে জনপ্রিয় ‘মাইজিও’ অ্যাপেরও একটি উন্নত এআই সংস্করণ আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন সংস্করণে ব্যবহারকারীরা শুধু নির্দেশ দিলেই বিভিন্ন জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন। যেমন ই-সিম সক্রিয় করা, আন্তর্জাতিক রোমিং প্যাক নির্বাচন করা, মোবাইল সংযোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা গ্রাহকসেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজ আরও দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে।

শুধু মোবাইল সেবাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না রিলায়েন্সের এআই পরিকল্পনা। স্মার্ট হোম প্রযুক্তির বাজারেও প্রবেশ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই লক্ষ্যে ‘জিও টেলিফ্রেম’ নামে একটি নতুন এআই ডিভাইস উন্মোচন করা হয়েছে। এটি ঘরের জন্য ব্যক্তিগত ডিজিটাল সহকারী হিসেবে কাজ করবে। ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন সময়সূচি মনে করিয়ে দেওয়া, আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ, গুরুত্বপূর্ণ নোট সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো সুবিধা থাকবে এতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্ট হোম প্রযুক্তি এখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অ্যামাজনের অ্যালেক্সা, গুগল হোম কিংবা অ্যাপলের স্মার্ট ডিভাইসের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে রিলায়েন্সের এই উদ্যোগ ভারতের প্রযুক্তি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

বার্ষিক সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মুকেশ আম্বানি বলেন, ভারত শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়ে থাকবে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ভাবন, উন্নয়ন এবং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জন করতে হবে। তার মতে, আগামী দশকে এআই প্রযুক্তি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসার ধরন আমূল বদলে দেবে।

রিলায়েন্স ইতোমধ্যে ‘রিলায়েন্স ইন্টেলিজেন্স’ নামে নিজস্ব এআই উদ্যোগ চালু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বিশেষায়িত এআই সমাধান তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় এসব সেবা পরিচালিত হবে। ফলে ইংরেজিভিত্তিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা দূর হবে এবং দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সরাসরি এআই সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে রিলায়েন্স বড় আকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো হচ্ছে। গুগল, মেটা এবং এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে শক্তিশালী ডেটা সেন্টার, উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং ভাষাভিত্তিক এআই মডেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু উদ্বেগও সামনে আসছে। বিশেষ করে ফোন কল, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং ঘরের অভ্যন্তরীণ তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ব্যবহারকারীদের তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, কতদিন রাখা হবে এবং এআই প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি রিলায়েন্স।

ডিজিটাল অধিকার কর্মীরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির বিস্তার যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে কঠোর তথ্য সুরক্ষা নীতি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি এআই প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতায় রিলায়েন্সের পাশাপাশি টাটা গ্রুপ, ইনফোসিস, উইপ্রো এবং আরও কয়েকটি বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে ভারত এআই খাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাজারে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে মুকেশ আম্বানির নতুন পরিকল্পনা শুধু একটি প্রযুক্তি উদ্যোগ নয়, বরং ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যতের একটি বড় রূপরেখা। ফোন কল থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি কোণে এআই পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা সফল হলে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা, কাজের ধরন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত