ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্র সামনে এসেছে। শিক্ষক সংকট, অনিয়মিত উপস্থিতি, ভাঙাচোরা অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক তদারকির অভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে একাধিক বিদ্যালয়। কোথাও মাসের পর মাস ক্লাস হচ্ছে না, কোথাও বিদ্যালয়ের কক্ষ দখল করে বসবাস করছে লোকজন, আবার কোনো কোনো স্কুল ভবনকে ব্যবহার করা হচ্ছে আড্ডা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে চরাঞ্চলের শত শত শিক্ষার্থী তাদের মৌলিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক পাওয়া যায় না। কিছু স্কুলে বছরের প্রথম ছয় মাসেও নিয়মিত পাঠদান হয়নি। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন স্কুলে এসে খালি শ্রেণিকক্ষ দেখে ফিরে যায়। এতে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কিছু শিক্ষক মাঝে মধ্যে স্কুলে এলেও তারা পাঠদানের চেয়ে প্রশাসনিক বা অন্যান্য কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকলেও ক্লাস পরিচালনা করা হয় না। ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
চরাঞ্চলের কয়েকটি বিদ্যালয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু স্কুল ভবনের কক্ষ অবৈধভাবে দখল করে আবাসিক ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে খাট, আলমারি, ফ্রিজ ও অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী স্থাপন করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এছাড়া কিছু বিদ্যালয়ের ভবনে মাদকসেবন, আড্ডাবাজি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের পাশাপাশি রাতেও এসব ভবনে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্গম চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় এখনো টিনের অস্থায়ী ঘরে পরিচালিত হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সেসব বিদ্যালয়ে পাঠদান চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব এবং সংকীর্ণ কক্ষের কারণে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, শিক্ষক সংকট এই সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ। বহু বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। কোথাও একজন শিক্ষক দিয়ে পুরো স্কুল পরিচালনা করা হচ্ছে, আবার কোথাও শিক্ষক না থাকায় বিকল্প ব্যক্তির মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে এমন অব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হার বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে এসব শিশু প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়বে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক সময় নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না বলেও জানিয়েছেন তারা। তবে শিক্ষক নিয়োগ এবং পর্যবেক্ষণ জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে জেলা শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদ্যালয় ভবন দখল, অনুপস্থিত শিক্ষক কিংবা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সংকট কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধুমাত্র নতুন শিক্ষক নিয়োগই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত মনিটরিং, বিদ্যালয় অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলার চরাঞ্চলের হাজারো শিশু এখনও শিক্ষার আলো পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে। তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা।
যেখানে একটি বিদ্যালয় হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের নিরাপদ স্থান, সেখানে যদি শ্রেণিকক্ষ দখল হয়ে যায়, ক্লাস বন্ধ থাকে এবং শিক্ষকের দেখা না মেলে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয় শিশুরাই। তাই চরাঞ্চলের শিক্ষা সংকট নিরসনে দ্রুত ও দৃশ্যমান উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।