প্রতি বছর বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় আতঙ্ক। নদীর পানি বাড়ে, ভাঙন এগিয়ে আসে বসতভিটার দিকে, আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটে হাজারো মানুষের। উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদীঘেঁষা জনপদের বাসিন্দাদের জীবনে এই দৃশ্য নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে বন্যা, নদীভাঙন ও জীবিকার সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখন তারা ত্রাণের চেয়ে স্থায়ী সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
স্থানীয় ভাষায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “রিলিফ চাই না, কাজ দেন। এমন ব্যবস্থা করেন যাতে বারবার ঘর হারাতে না হয়।” তাদের এই আহাজারির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা এবং উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকার গল্প।
তিস্তাপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, নদীভাঙনের কারণে বহু পরিবার একাধিকবার বসতভিটা পরিবর্তন করেছে। কারও ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, কেউ হারিয়েছেন চাষের জমি, আবার কেউ বাধ্য হয়েছেন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে। অনেক পরিবারের কাছে এখন নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং ভয় এবং অনিশ্চয়তার প্রতীক।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, বছরের পর বছর নদীর ভাঙনে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। একসময় যেখানে ধান, ভুট্টা, পাট কিংবা বিভিন্ন শাকসবজির চাষ হতো, সেখানে এখন নদীর স্রোত বইছে। এতে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।
তিস্তার চরে বসবাসকারী অনেক মানুষের অভিযোগ, দুর্যোগের সময় কিছু ত্রাণ সহায়তা মিললেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন উদ্যোগ খুব কমই চোখে পড়ে। তারা বলছেন, কয়েক কেজি চাল বা শুকনো খাবার সাময়িক কষ্ট কমাতে পারে, কিন্তু জীবনের স্থায়ী সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
এলাকার তরুণদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের অভাবে অন্য জেলায় কিংবা রাজধানীতে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকে দিনমজুর, রিকশাচালক বা স্বল্প আয়ের বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে শিল্প-কারখানা কিংবা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় পরিবার ছেড়ে দূরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
শিক্ষার্থীরাও নানা সমস্যার মুখোমুখি। বর্ষা মৌসুমে অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় নিয়মিত স্কুল-কলেজে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের ঘটনাও নতুন নয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, তিস্তা অববাহিকার মানুষের সমস্যা বহুমাত্রিক। শুধু বন্যা নয়, নদীশাসন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং কৃষি সহায়তাসহ সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি। নদীর গতিপ্রকৃতি, পানি প্রবাহ, ভাঙনপ্রবণ এলাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই সংকট নতুন করে ফিরে আসবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নদীভাঙনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা নয়, বরং দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও বলছেন, তিস্তাপাড়ের মানুষের কণ্ঠস্বর জাতীয় পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ এ অঞ্চলের মানুষের সমস্যা কেবল একটি জেলার নয়, এটি দেশের বৃহত্তর নদী ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও জড়িত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, তারা সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের খবর শুনেছেন এবং বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন। তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে যাতে ঘরবাড়ি, জমি এবং জীবিকা হারানোর ভয় নিয়ে আর বেঁচে থাকতে না হয়।
তিস্তাপাড়ের মানুষের ভাষায়, তারা ভিক্ষা বা সাময়িক সহায়তা চান না; চান নিরাপদ জীবন, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং টেকসই নদীশাসন। তাদের বিশ্বাস, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলও উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে।
তাই তিস্তার তীর থেকে আজ যে আহ্বান উচ্চারিত হচ্ছে, তার মূল কথা একটাই—“ত্রাণ নয়, টেকসই সমাধান চাই।” বছরের পর বছর ধরে বন্যা ও ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলা মানুষের এই দাবিই এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় বাস্তবতা।