প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পার্শ্ববর্তী অরুণাচল প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর উপনদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজ্যের কয়েকটি জেলায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার প্রথম ঢেউয়েই অন্তত ছয়টি জেলার ২২ হাজারের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
রবিবার (২৮ জুন) সরকারি কর্মকর্তারা জানান, অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে আসামের বিভিন্ন নদ-নদীতে পানির চাপ বেড়েছে। এর ফলে নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে এবং বহু মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ধেমাজি, নলবাড়ি, ডিব্রুগড়, চিরাং, লখিমপুর ও কোকড়াঝাড় জেলায় বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় মোট ২২ হাজার ১২৪ জন মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ধেমাজি জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে প্রায় ১৫ হাজার ৪৮৩ জন মানুষ ক্রমবর্ধমান পানির কারণে দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বন্যার পানিতে ইতোমধ্যে ৯৬টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রায় এক হাজার ৬৯০ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে গেছে বলে সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক তাদের পরিশ্রমের ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
শুধু মানুষের জীবনযাত্রাই নয়, বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণী। সরকারি হিসাবে, প্রায় ৪৮ হাজার ১৯৯টি গবাদিপশু ও প্রাণী এই দুর্যোগের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রবল বর্ষণের কারণে নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শিবসাগর জেলার নাঙ্গলামুরাঘাট এলাকায় দিসাং নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে বন্যার প্রভাব পড়েছে রেল যোগাযোগেও। ধেমাজি জেলায় শিমেন নদীর ওপর নির্মিত একটি রেলসেতুর একটি অংশ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে) জানিয়েছে, ভারি বৃষ্টিপাত ও নদীভাঙনের কারণে সেতুটির একটি স্তম্ভ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধেমাজি ও আশপাশের এলাকায় ১১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে নদীর তীরের বড় একটি অংশ ধসে যাওয়ায় সেতুর একটি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৬৫ সালে নির্মিত ওই সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ অবস্থায় ছিল। কিন্তু আকস্মিক ভারি বর্ষণ ও নদীর প্রবল স্রোতের কারণে সেতুর নিচের মাটি ক্ষয়ে গিয়ে একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগেই ওই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনো ট্রেন দুর্ঘটনা বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বর্তমানে আর্চিপাথার ও সিমন চাপারি স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশে ট্রেন চলাচল স্থগিত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনসুকিয়া বিভাগের মুরকংসেলেক ও সিলাপাথারের মধ্যকার রেল যোগাযোগও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মুরকংসেলেক থেকে সিলাপাথার পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ধেমাজি, সিলাপাথার ও মুরকংসেলেক রেলস্টেশনে যাত্রীদের সহায়তার জন্য বিশেষ হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে।
আসামের বন্যা প্রতিবছরই বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর বিস্তৃত উপনদীগুলোর কারণে রাজ্যের অনেক এলাকা বর্ষাকালে পানির নিচে চলে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসামের মতো নদীবহুল অঞ্চলে বন্যা মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। নদী ব্যবস্থাপনা, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষ। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষি, পশুপালন ও স্থানীয় ব্যবসার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা ও রাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহের কাজ চলছে। পাশাপাশি বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আসামের এই বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে মানুষের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি ও নদীর পানির স্তরের ওপর নির্ভর করবে বন্যার ভয়াবহতা কতটা বাড়বে বা কমবে।