এআই নিয়ে ক্ষুব্ধ ম্যাডোনা, বললেন শিল্পের বিপরীত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ৮ বার
এআই নিয়ে ক্ষুব্ধ ম্যাডোনা, বললেন শিল্পের বিপরীত

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্বখ্যাত পপতারকা ম্যাডোনা। নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা সৃজনশীলতার স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রকৃত শিল্প সৃষ্টির মূল চেতনার বিপরীত।

ফ্যাশন সাময়িকী ‘ভোগ ইতালিয়া’-কে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে সংগীত জগতের এই কিংবদন্তি শিল্পী এআই নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি সৃজনশীল ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনছে, তবে শিল্পের ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার জায়গা কোনো যন্ত্র পুরোপুরি দখল করতে পারে না।

ম্যাডোনার ভাষ্য অনুযায়ী, এআইয়ের ওপর নির্ভর করে শিল্প তৈরি করা অনেকটা শিল্প সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকেই দূরে সরে যাওয়া। কারণ শিল্প শুধু একটি নিখুঁত ফলাফল তৈরির বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতি, সংগ্রাম, চিন্তা ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংগীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা ও অন্যান্য সৃজনশীল ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। অনেক শিল্পী ও নির্মাতা এআইকে নতুন সম্ভাবনার হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও ম্যাডোনার মতো অনেকেই এর অতিরিক্ত ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

ম্যাডোনা মনে করেন, বর্তমান সময়ে অনেক শিল্পীর মনোযোগ সৃষ্টিশীলতার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংখ্যা ও জনপ্রিয়তার হিসাবের দিকে বেশি চলে যাচ্ছে। একজন শিল্পীর কাজের মূল্যায়নে এখন অনেক সময় তার প্রতিভা বা সৃষ্টির গভীরতার চেয়ে অনুসারীর সংখ্যা, লাইক ও অনলাইন উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ের কথা স্মরণ করে ম্যাডোনা বলেন, তখন শিল্পীরা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতেন। চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ও অন্যান্য সৃজনশীল মানুষ একসঙ্গে কাজ করতেন, একে অপরের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিল্পের জগতে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংখ্যার এই প্রতিযোগিতার বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজের জনপ্রিয় গান ‘ব্রিং ইওর লাভ’-এর একটি ভাবনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। গানটির একটি লাইনে সংখ্যার মাধ্যমে বিভ্রান্ত না হওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন ম্যাডোনা। তার মতে, শিল্পের প্রকৃত মূল্য কোনো সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ম্যাডোনা বলেন, নিজের ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি চার্ট, স্ট্রিমিং সংখ্যা বা জনপ্রিয়তার হিসাব নিয়ে অতটা চিন্তিত ছিলেন না। বরং তিনি নতুন কিছু তৈরি করার ঝুঁকি নিতে এবং নিজের সৃজনশীলতাকে অনুসরণ করতে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় নিরাপদ ও পূর্বনির্ধারিত পথকে উৎসাহিত করে, যেখানে শিল্পের বড় অংশ তৈরি হয় নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস থেকে।

নতুন সংগীত তৈরির অনুপ্রেরণা কীভাবে খুঁজে পান—এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাডোনা জানান, সৃজনশীল কাজের সময় তিনি প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। তিনি মনে করেন, প্রকৃত কল্পনাশক্তি ফিরে পেতে মানুষের নিজের সঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন।

নিজের সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই পপসম্রাজ্ঞী বলেন, জীবনের কঠিন সময় পার করার পর তিনি অনেক সময় বিরতি নিতে এবং মানুষের চোখের আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন। তার মতে, নীরবতা ও একাকিত্ব অনেক সময় নতুন সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও অনুপ্রেরণা তৈরি করে।

ম্যাডোনা বলেন, সৃজনশীলতার জন্য স্থিরতা প্রয়োজন। প্রকৃতি, পরিবার এবং নিজের কাছের জিনিসগুলোর সঙ্গে সময় কাটানো একজন শিল্পীর কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। প্রযুক্তির অবিরাম উপস্থিতির বাইরে গিয়ে নিজের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে ম্যাডোনা এর আগেও কথা বলেছেন। তার ‘কনফেশনস টু – দ্য ফিল্ম’ সিনেমার প্রিমিয়ারে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের সমালোচনা করেছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও বাস্তব জীবনের যোগাযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশে তিনি ফোনের পর্দা থেকে দূরে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার মতে, মানুষের প্রকৃত সংযোগ তৈরি হয় মুখোমুখি কথোপকথন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, শুধু ডিজিটাল উপস্থিতির মাধ্যমে নয়।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীতশিল্পী হিসেবে ম্যাডোনার এই মন্তব্য প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে এআই শিল্পীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে এর ব্যবহার নিয়ে নৈতিকতা, মৌলিকতা ও মানবিক সৃষ্টিশীলতার প্রশ্নও সামনে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের সৃজনশীল জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের নিজস্ব চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ম্যাডোনার বক্তব্য মূলত সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে—প্রযুক্তি কি শিল্পীর সহায়ক হবে, নাকি একসময় মানুষের সৃষ্টিশীলতার জায়গা দখল করবে? এই বিতর্কের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। তবে পপসম্রাজ্ঞীর স্পষ্ট বার্তা হলো, প্রকৃত শিল্পের প্রাণ নিহিত থাকে মানুষের অভিজ্ঞতা, আবেগ ও কল্পনার মধ্যে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত