শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা, বনানীতে চিরনিদ্রায় মুস্তাফা মনোয়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ৭ বার
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা, বনানীতে চিরনিদ্রায় মুস্তাফা মনোয়ার

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, বরেণ্য চিত্রশিল্পী, শিল্পশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মঙ্গলবার সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে দেশের চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য অবদান রাখা এই গুণী শিল্পীর মরদেহ শেষবারের মতো নেওয়া হবে তার প্রিয় কর্মস্থল ও শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে মুস্তাফা মনোয়ারকে। এর আগে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজার আয়োজন করা হয়েছে। শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় শিল্পীকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পাবেন।

শিল্পী মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ বিদায়ের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টায় প্রথমে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নেওয়া হবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হিসেবে বিটিভির সঙ্গে তার ছিল গভীর সম্পর্ক। সেখানে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান ছিল স্মরণীয়। বাংলাদেশের টেলিভিশন সংস্কৃতির বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণ, নান্দনিক উপস্থাপনা এবং শিল্পের সহজ প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে তিনি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন।

এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় তার মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও ভাষা-সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাবেন সাধারণ মানুষ।

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার। চারুকলার শিক্ষক, সহকর্মী, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা সেখানে তাদের প্রিয় শিক্ষককে শেষ বিদায় জানাবেন।

চারুকলায় তার উপস্থিতি ছিল শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে। বহু তরুণ শিল্পী তার কাছ থেকে শিল্পের সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা পেয়েছেন। তার হাত ধরে দেশের চিত্রকলার নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়েছে।

চারুকলার আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেলে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। শেষ বিদায়ের এসব কর্মসূচিতে দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে মুস্তাফা মনোয়ারের গোসল সম্পন্ন হয়। এরপর তার মরদেহ ধানমন্ডির বাসভবনে নেওয়া হলে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। বিকেল পর্যন্ত বাসভবনে রাখার পর মরদেহ সংরক্ষণের জন্য স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে নেওয়া হয়।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী ও বিশিষ্টজনরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তার চলে যাওয়া দেশের সৃজনশীল জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান।

শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা মুস্তাফা মনোয়ার পরবর্তী সময়ে নিজের প্রতিভা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে দেশের শিল্পাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হন। চিত্রকলার পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, শিশুদের সৃজনশীল বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে তার নাম বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে তিনি যে নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘদিন দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। তার সৃষ্টিশীলতা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও মানবিক মূল্যবোধে পরিপূর্ণ।

একজন শিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ার শুধু ছবি আঁকার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তার কাজের মধ্যে দেশ, মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যায়।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘ অবদান তাকে দিয়েছে সর্বজনীন সম্মান ও ভালোবাসা।

মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তার সৃষ্টি, শিক্ষা ও চিন্তাধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের পথ দেখাবে।

একজন শিল্পী চলে গেলেও তার সৃষ্টিশীলতা, শিক্ষা ও আদর্শ থেকে যায় মানুষের মাঝে। মুস্তাফা মনোয়ারও তেমনই এক শিল্পী, যার রঙ, রেখা, ভাবনা ও সৃজনশীলতার স্মৃতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন অম্লান থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত