যে ভুলগুলো লিভারকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬
  • ৫ বার
যে ভুলগুলো লিভারকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ দূর করা, হজমে সহায়তা করা, শক্তি সঞ্চয় করা এবং বিপাকীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে লিভারের ভূমিকা অপরিহার্য। অথচ আধুনিক জীবনযাত্রার নানা অনিয়মের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, লিভারের অনেক সমস্যা শুরু হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তা সহজে বোঝা যায় না।

বর্তমানে ফ্যাটি লিভার একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার মতো স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। অনেকের ধারণা, শুধু অ্যালকোহল পান করলেই ফ্যাটি লিভার হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, অ্যালকোহল না খেলেও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে।

ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা, যখন লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। স্বাভাবিক অবস্থায় লিভারে সামান্য পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন লিভারের মোট ওজনের ৫ শতাংশের বেশি অংশ চর্বিতে পরিণত হয়, তখন সেটিকে ফ্যাটি লিভার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে অ্যালকোহলবিহীন ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের (NAFLD) প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া।

অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা ফ্যাটি লিভারের অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে পেটের অতিরিক্ত মেদ শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে এবং লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহারও ফ্যাটি লিভারের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোমল পানীয়, মিষ্টি জাতীয় খাবার, ফাস্টফুড, কেক, বিস্কুট এবং অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে শরীরে বাড়তি ক্যালরি জমা হয়। এই অতিরিক্ত শক্তি একসময় চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে লিভারে জমতে পারে।

ডায়াবেটিসের সঙ্গেও ফ্যাটি লিভারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে এবং লিভারে চর্বি জমার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকাও লিভারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শরীরে ক্ষতিকর চর্বির পরিমাণ বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু রক্তনালি বা হৃদ্‌যন্ত্রে নয়, লিভারের ওপরও পড়ে।

শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম না করা এবং অলস জীবনযাপন শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ায়। নিয়মিত শরীরচর্চা না করলে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ লিভারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভারের সৃষ্টি হতে পারে। তবে অ্যালকোহল না খেলেও যে ফ্যাটি লিভার হতে পারে, সেই বিষয়টি অনেকেরই অজানা।

কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, অপুষ্টি কিংবা কিছু হরমোনজনিত সমস্যার কারণেও ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই কোনো ওষুধ দীর্ঘদিন গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এটি অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই শরীরে অবস্থান করে। অনেক মানুষ অন্য কোনো পরীক্ষার সময় হঠাৎ জানতে পারেন যে তাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে।

তবে রোগের মাত্রা বাড়লে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন ডান পাশের ওপরের পেটে অস্বস্তি বা হালকা ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা, ক্ষুধা কমে যাওয়া এবং গুরুতর অবস্থায় অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম লিভারকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে সবজি, ফলমূল, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন ও পরিমিত খাবারের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি। কারণ এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

লিভার শরীরের নীরব কর্মী। এটি দীর্ঘদিন নিজের কাজ করে যায়, কিন্তু ক্ষতি শুরু হলেও অনেক সময় কোনো সংকেত দেয় না। তাই সুস্থ থাকতে হলে লিভারের যত্ন নিতে হবে আগেভাগেই। সচেতন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হতে পারে ফ্যাটি লিভারসহ লিভারের নানা জটিলতা থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত