প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে নিজেদের শক্তির জানান দিল বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স। আক্রমণাত্মক ফুটবল, ধারাবাহিক চাপ এবং অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ফরাসিরা।
ম্যাচের ফলাফল হয়তো ফ্রান্সের আধিপত্যের পুরো চিত্র তুলে ধরতে পারছে না। কারণ পুরো ৯০ মিনিটে মাঠে ছিল একতরফা লড়াই। সুইডেনের রক্ষণভাগ বারবার ভেঙে পড়েছে ফরাসি আক্রমণের সামনে। বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই বল দখল ও আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ নেয় ফ্রান্স। সুইডেন চেষ্টা করেছিল সংগঠিত রক্ষণ দিয়ে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে, কিন্তু এমবাপ্পে ও তার সতীর্থদের গতির সামনে বেশির ভাগ সময়ই অসহায় দেখিয়েছে তাদের।
ফ্রান্সের হয়ে প্রথম বড় সাফল্য আসে অধিনায়ক এমবাপ্পের কাছ থেকেই। বিশ্বসেরা এই ফরোয়ার্ড নিজের গতি ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে সুইডেনের প্রতিরোধ ভেঙে দেন। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে আরও একবার গোল করে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন তিনি।
এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের অনন্য রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে মাত্র ১৮ ম্যাচ খেলেই ১৮টি গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। তরুণ বয়সেই এমন ধারাবাহিকতা তাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের কাতারে নিয়ে যাচ্ছে।
ম্যাচে ফ্রান্সের হয়ে অন্য গোলটি করেন ব্রাডলি বারকোলা। আক্রমণভাগে তার কার্যকর উপস্থিতি সুইডেনের রক্ষণকে আরও চাপে ফেলে। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও দেজিরে দুয়েরারাও একাধিক সুযোগ তৈরি করেন। তবে কখনো গোলরক্ষকের দক্ষতা, কখনো ফিনিশিংয়ের ঘাটতিতে ব্যবধান বাড়েনি।
সুইডেনের জন্য সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় ছিল গোলের সংখ্যা মাত্র তিনে থেমে যাওয়া। পুরো ম্যাচের চিত্র বিবেচনা করলে ফ্রান্স আরও কয়েকটি গোল করতে পারত। ফরাসি খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক ধার, দ্রুত পাসিং এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ সুইডেনকে প্রায় পুরো ম্যাচজুড়েই রক্ষণাত্মক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করে।
এই ম্যাচটি ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্যও ছিল বিশেষ আবেগের। মায়ের মৃত্যুশোক কাটিয়ে তিনি এই ম্যাচ দিয়েই দলের ডাগআউটে ফিরেছেন। কঠিন ব্যক্তিগত সময়ের পর মাঠে ফিরে দলের এমন দাপুটে জয় দেশমের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির মুহূর্ত হয়ে এসেছে।
ম্যাচ শেষে ফ্রান্স শিবিরে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই কঠিন, তবে সুইডেনের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দেখিয়েছে কেন ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এখন ফ্রান্সের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। শেষ ষোলো পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে তাদের লড়তে হবে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। আগামী শনিবার রাতে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচ।
প্যারাগুয়ে অবশ্য সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তারা এরই মধ্যে বড় চমক দেখিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করেছে। ফলে ফ্রান্সের জন্য পরবর্তী ম্যাচে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য। এমবাপ্পের ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলের অন্য খেলোয়াড়রাও নিয়মিত গোলের সুযোগ তৈরি করছেন। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য শুধু একজন খেলোয়াড়কে আটকে রাখলেই ফ্রান্সকে থামানো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, এমবাপ্পের ওপর প্রত্যাশার চাপও বাড়ছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে তিনি এর আগেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এবারও তার লক্ষ্য শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, বরং ফ্রান্সকে আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফির পথে এগিয়ে নেওয়া।
ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের মঞ্চে তারকা খেলোয়াড়দের অবদান সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জিনেদিন জিদান থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের এমবাপ্পে—প্রতিটি প্রজন্মেই ফ্রান্স পেয়েছে বড় ম্যাচের নায়ক। সুইডেনের বিপক্ষে এই ম্যাচে এমবাপ্পে আবারও প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে চাপ সামলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে।
বিশ্বকাপের পথ এখন আরও কঠিন হবে। কিন্তু সুইডেনের বিপক্ষে পাওয়া এই জয় ফ্রান্সকে শুধু পরবর্তী রাউন্ডে জায়গা করে দেয়নি, বরং শিরোপার দৌড়ে তাদের আত্মবিশ্বাসও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এমবাপ্পের নেতৃত্বে ফরাসিরা এখন তাকিয়ে আছে আরও বড় লক্ষ্যের দিকে।