প্রকাশ: ১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে নতুন এক আলোচনার সূত্রপাত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার দল ইতিমধ্যে একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন সম্পন্ন করেছে। যদিও এই ছায়া মন্ত্রিসভার কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই, তবে গণতান্ত্রিক বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংসদীয় চর্চায় এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা। ডা. শফিক জানান, উপযুক্ত সময় হলেই তারা এই ছায়া মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও রূপরেখা জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। তার এই ঘোষণা দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংসদের কার্যক্রম এবং সরকারি দলের আচরণের বিষয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে ডা. শফিক বলেন, তারা এই সংসদকে কেবল গান-বাজনার উৎস হিসেবে দেখতে চান না, বরং এটিকে একটি দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব সংসদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। জনগণের নিত্যদিনের সমস্যা এবং সেগুলোর টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের বর্তমানে একটি স্থিতিশীল সংসদ প্রয়োজন এবং সেই লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারি দলের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, সংসদ যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে বিরোধী দলের পর্যাপ্ত সময় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সংসদেই এখন বিরোধী দল বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণকে দেওয়া ওয়াদা থেকে জামায়াত এক চুলও নড়বে না এবং প্রয়োজনে রাজপথের আন্দোলনে নামতে তারা কুণ্ঠাবোধ করবে না।
বিএনপির সাথে বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ নিয়েও ডা. শফিক খোলামেলা কথা বলেছেন। তার দাবি, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, অথচ বিএনপি সেই রায়কে অগ্রাহ্য ও অপমান করেছে। সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিএনপির অনাগ্রহের বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সংবিধানে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উল্লেখ ছিল না, অথচ সেই সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি এখন ক্ষমতায় আসীন। এই দ্বিমুখী অবস্থান নিয়ে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মতে, জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়েছে, কেবল সংবিধান সংশোধনের নয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান সরকার জনরায় মেনে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে, অন্যথায় দেশ আবারও বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে।
বাজেট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জামায়াত তার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী একটি ছায়া বাজেট পেশ করেছিল। সরকার যে বাজেট দিয়েছে তা তাদের ধারণার সাথে মিলে গেছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলসহ বেশ কিছু প্রস্তাব সরকার আমলে নেওয়ায় তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দুর্নীতি রোধ করাই বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা না গেলে বিদেশে টাকা পাচার আবারও মহামারি আকার ধারণ করবে। যদিও সরকার এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে দাবি করছে, কিন্তু কেবল বিশাল অংকের বাজেটই যে উন্নয়নের মাপকাঠি নয়, সে কথা তিনি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন।
সংসদ সদস্যদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ডা. শফিকুর রহমান তার দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং প্লট গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারি ফ্ল্যাট গ্রহণের বিষয়টি ভিন্ন, কারণ এগুলো সংসদ সদস্যদের স্থায়ী সম্পদ হিসেবে দেওয়া হয় না, বরং তাদের বসবাসের জন্য সাময়িকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে জামায়াতের সহযোগিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তিনি তুলে ধরেন। তবে বর্তমান জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বা জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে তিনি কোনো বিশেষ তৎপরতা দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন।
পরিশেষে, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য আগামী দিনের রাজনীতির একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিরোধী দল কেবল সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ছায়া মন্ত্রিসভার মাধ্যমে বিকল্প নীতি নির্ধারণী প্রস্তাবনার দ্বারা সরকারকে সঠিক পথে চলতে বাধ্য করবে। জাতীয় স্বার্থে সংস্কারের যে আলাপ-আলোচনা চলছে, তা যেন রাজনীতির অঙ্গনে নতুন বিভাজনের সৃষ্টি না করে বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করে, সেটাই সাধারণ মানুষের চাওয়া। জামায়াত আমির রাজপথে আন্দোলন এবং সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থানের যে দ্বিমুখী কৌশলের কথা বলেছেন, তা আগামী দিনগুলোতে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সুস্থ রাজনৈতিক ধারায় ফিরতে হলে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ইস্যুতে একমত হওয়ার বিকল্প নেই, যা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল।