প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দশ বছর আগে আজকের এই দিনে রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া নৃশংস সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। ২০১৬ সালের সেই কালরাতে মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধতা ভেঙে আগত গুলির শব্দ আর আর্তনাদে কেঁপে উঠেছিল কূটনৈতিক পাড়া। আজ সেই মর্মান্তিক ঘটনার ১০ম বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা স্মরণ করছেন সেই সকল মানুষকে, যারা সেদিন অন্ধকারের শক্তির হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন। ঢাকার ইতালি দূতাবাসে আয়োজিত এক স্মরণসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, বাংলাদেশ কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবে না এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
স্মরণসভাটি এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে সূচিত হয়। ইতালি দূতাবাসের কনস্যুলার চ্যান্সেলরির প্রধান লরা শিলা যখন হামলার শিকার সেই ২৪ জনের নাম একে একে পাঠ করছিলেন, তখন উপস্থিত কূটনীতিকদের চোখেমুখে ছিল গভীর শোক ও সহমর্মিতার ছাপ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সেই ভয়াল রাতে ২০ জন জিম্মি, দুই পুলিশ কর্মকর্তা এবং ছয়জন হামলাকারীসহ মোট ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় ১২ ঘণ্টার সেই শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি সংকট পুরো বিশ্বকে হতবাক করেছিল। আজ এক দশক পর, সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে উপস্থিত হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। অনুষ্ঠানে ভারত, জাপান, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপ এবং বিগত বছরগুলোতে সরকারের অর্জিত সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, সন্ত্রাসবাদকে কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, হোলি আর্টিজানের সেই নারকীয় হামলার পর বাংলাদেশ সরকার যে সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে এবং জড়িতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে, তা বিশ্ববাসীর জন্য একটি বার্তা। সরকার সন্ত্রাস দমনে কেবল জাতীয় পর্যায়েই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জঙ্গিবাদ দমনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার পর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে, তারা অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে আপসহীন। তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অশুভ শক্তিকে বাধা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না।
অনুষ্ঠানে পুষ্পস্তবক অর্পণের সময় এক মানবিক ও গাম্ভীর্যপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত এবং কূটনৈতিক কোরের ডিন ইউসেফ এসওয়াই রামাদান, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা, ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী এবং মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত উপমিশন প্রধান আলবার্ট সিয়া। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়, যা ছিল সেই হারানো প্রাণগুলোর প্রতি সমগ্র রাষ্ট্রের সম্মিলিত শোক ও বেদনার বহিঃপ্রকাশ। কূটনীতির ভাষায় এই এক মিনিট নীরবতা ছিল মানবতার পক্ষে এক অটুট ঐক্যের প্রতীক।
হোলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই ঘটনা কেবল একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর একটি বড় আঘাত। তবে সেই আঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে সন্ত্রাস দমনে একটি রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বিদেশিরা যেন বাংলাদেশে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন এবং কাজ করতে পারেন, তার জন্য কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ তার বক্তব্যে সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পুনরায় প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, আমরা কেবল নিজেদের সুরক্ষায় নয়, বরং একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়ার অংশ হিসেবে জঙ্গিবাদ নির্মূলে অঙ্গীকারবদ্ধ।
আজকের এই দশম বার্ষিকীর স্মরণসভা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি সেই সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি অঙ্গীকার, যারা তাদের জীবন দিয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, শান্তি ও সম্প্রীতিই মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি। সহিংসতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, কিন্তু ঐক্য আমাদের শক্তি জোগায়। আজ যখন পুরো বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের নতুন নতুন হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে, তখন বাংলাদেশের এই দৃঢ় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য এক বড় ভরসা। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রতিটি নাগরিককে সজাগ থাকতে হবে এবং কোনো অপপ্রচার বা উগ্রবাদী আদর্শকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, ১০ বছর আগের সেই কালরাত্রির আতঙ্ক আজও আমাদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়, কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার সক্ষমতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই দৃঢ় ঘোষণা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীসহ সকল পর্যায়ের মানুষের মনে এক আশার সঞ্চার করবে। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে—এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা। নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা যেন আগামী দিনে একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারি, সেই শপথই আজ পুনর্নবায়ন করা হলো। সন্ত্রাসবাদ মুক্ত, শান্তিময় এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা অব্যাহত থাকবে, আর এটাই হবে সেই অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।