প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে অন্যের অধিকার ও সুবিধার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে মসজিদের জুমার খুতবা, বয়ান বা নামাজের সময় লাউড স্পিকার বা মাইকের ব্যবহার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদকে আমরা যখন অন্যের কষ্টের কারণ হিসেবে ব্যবহার করি, তখনই তা শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। প্রাজ্ঞ আলেমরা বরাবরই বলে আসছেন, মসজিদের মাইক ব্যবহারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মূলত মসজিদের ভেতর উপস্থিত মুসল্লিদের সুবিধার্থেই। মাইকের আওয়াজ যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই রাখা উচিত যাতে উপস্থিত শ্রোতারা তা স্পষ্টভাবে শুনতে পারেন। মসজিদের বাইরে বা অনেক দূর পর্যন্ত মাইকের আওয়াজ ছড়িয়ে দিয়ে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে বয়ান পৌঁছানোর কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই, বরং এর মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ থাকে।
মাইকের ব্যবহার নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট। বিশেষ করে নামাজের সময় লাউড স্পিকারের আওয়াজ কেবল ততটুকুই রাখা উচিত, যা দিয়ে মুসল্লিরা বিভ্রান্তি ছাড়াই নামাজ সম্পন্ন করতে পারেন। অতিরিক্ত আওয়াজ বৃদ্ধি করা কেবল অনর্থকই নয়, বরং তা পরিহারযোগ্য একটি কাজ। জুমার আগে মসজিদে যে বয়ান বা ধর্মীয় আলোচনা হয়, তা মাইকের মাধ্যমে প্রচার করার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে উপস্থিত মুসল্লিদের উপদেশ প্রদান। কিন্তু যদি এই বয়ান বা তিলাওয়াত মাইকের মাধ্যমে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজে বা বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটে, তবে সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলাম মানুষকে পরোপকারী হওয়ার শিক্ষা দেয়, অন্যের কষ্টের কারণ হওয়ার অনুমতি কোনোভাবেই প্রদান করে না।
ইসলামি ফিকহশাস্ত্রের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘ফাতাওয়ায়ে শামি’-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মসজিদ বা মসজিদের বাইরে ধর্মীয় আলোচনা করা অবশ্যই উত্তম ও সওয়াবের কাজ। কিন্তু এই আলোচনার একটি অবিচ্ছেদ্য শর্ত হলো, এর শব্দ যেন ঘুমন্ত ব্যক্তি, মসজিদে ইবাদতরত মুসল্লি বা ব্যক্তিগতভাবে কোরআন তিলাওয়াতকারীর জন্য কষ্টের কারণ না হয়। যদি উচ্চৈঃস্বরে মাইক ব্যবহারের ফলে মানুষের ঘুম ভেঙে যায় বা তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে, তবে সেই আওয়াজ প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। একই গ্রন্থের অন্য একটি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কেউ উচ্চস্বরে কোরআন তিলাওয়াত করে অন্যের ইবাদতে বা মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়, তবে তিলাওয়াতকারীই গুনাহগার হবেন। অন্যের মনোযোগ বা বিশ্রাম নষ্ট করে নেক কাজ করা শরীয়তের মাকসাদ বা উদ্দেশ্য নয়।
‘ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি’-তেও বিষয়টি নিয়ে সতর্কবাণী রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ইমাম নামাজের প্রয়োজনে যতটুকু আওয়াজ করা প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি উচ্চৈঃস্বরে তিলাওয়াত করেন, তিনি অন্যায় বা বাড়াবাড়ি করছেন। কোরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন তা শুনে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং তাতে স্থিরতা পায়। যদি তিলাওয়াতের আওয়াজ অসহনীয় পর্যায়ের হয়, তবে তা মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং অস্থিরতা তৈরি করে। ইবাদতের পরিবেশ হতে হবে শান্ত ও মনোমুগ্ধকর, বিশৃঙ্খল নয়। সুতরাং মসজিদের মাইকের ভলিউম বা শব্দসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মসজিদ কর্তৃপক্ষের অবশ্যই সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে মানবিক দিকগুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত। হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানের পাশে মসজিদ থাকলে সেখানে মাইকের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। অসুস্থ ব্যক্তিরা অনেক সময় চরম অস্থিরতায় থাকেন, মাইকের উচ্চশব্দ তাদের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ক্ষেত্রেও, যেখানে বৃদ্ধ, শিশু এবং অসুস্থ মানুষ বসবাস করেন। ধর্ম প্রচারের নামে যদি অন্যের স্বাভাবিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়, তবে তা ইসলামি শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পরিপন্থী। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে, নিজের ইবাদত যেন অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়। মাইকের ব্যবহার যেন হয় কেবল প্রয়োজনের তাগিদে এবং সংযমের সাথে।
আমরা যদি আবেগতাড়িত না হয়ে শরীয়তের এই ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনাগুলো মেনে চলি, তবেই মসজিদ কেন্দ্রিক ইবাদত ও ধর্মীয় পরিবেশ অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে। মসজিদের আওয়াজ মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি নিয়ে আসবে, না কি বিরক্তি সৃষ্টি করবে—তা নির্ভর করে আমাদের সচেতন ব্যবহারের ওপর। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও ইসলামের বিধানের যথার্থ সমন্বয় ঘটাতে পারলে আমাদের ইবাদত হবে আরও বেশি সুন্দর ও মার্জিত। দিনশেষে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আমাদের উচিত হবে মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার বর্জন করে একটি সুশৃঙ্খল ও পরমতসহিষ্ণু সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখা।
পরিশেষে বলা যায়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা ইবাদতে মাইকের ব্যবহার কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত নয়। মসজিদের ইমাম ও পরিচালনা কমিটির উচিত মুসল্লিদের সংখ্যা ও মসজিদের অবস্থানের কথা মাথায় রেখে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা। মাইকের মাধ্যমে প্রচার বা বয়ানের উদ্দেশ্য যেন হয় ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছানো, যা মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে। যদি কোনো আমলের মাধ্যমে অজান্তেই অন্যের কষ্ট হয়, তবে সেই আমল থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতিটি কাজকে তার সন্তুষ্টির উপযোগী এবং অন্যের জন্য কল্যাণকর হওয়ার তৌফিক দান করুন। ইসলামের সুমহান আদর্শকে আমরা যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারি।