জুনে রপ্তানিতে ইতিবাচক মোড়, কাটছে ধীরগতির সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
জুনে রপ্তানিতে ইতিবাচক মোড়, কাটছে ধীরগতির সংকট

প্রকাশ: ৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি রপ্তানি খাত এক কঠিন সময় পার করছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং প্রধান বাজারগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাবে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানি আয়ে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। তবে বছরের শেষ প্রান্তিকে, বিশেষ করে জুন মাসের পরিসংখ্যান নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। দীর্ঘ মন্দার মেঘ কাটিয়ে জুনে রপ্তানি আয়ের রেকর্ড ভাঙা চিত্র এখন নতুন করে আশাবাদী করে তুলছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের। যদিও সারা বছরের হিসাবনিকাশে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কিছুটা কম, তবুও প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টা এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যান বলছে, বছরজুড়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আমাদের রপ্তানি সক্ষমতাকে চাপের মুখে ফেলেছিল। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বড় বাজারগুলোতে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক জটিলতার কারণে পোশাক খাতের অর্ডার কমে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন পর্যায়েও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় কমে যাওয়া ছিল এক বড় ধাক্কা।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এস আবু তৈয়ব মনে করেন, এটি নিছক বাংলাদেশের নিজস্ব সংকট নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তৈরি পোশাকের মতো শ্রমঘন খাতে যখন আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা কমে যায়, তখন তার প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়াটাই স্বাভাবিক। তবে এই সংকটের মধ্যেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিতে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ তার রপ্তানি পণ্যের ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর পথে হাঁটছে। কৃষিজাত পণ্য, ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম এবং হোম টেক্সটাইল খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেশের রপ্তানি সক্ষমতার শক্ত ভিত্তিকে নতুন করে জানান দিচ্ছে।

তৈরি পোশাক খাতের জন্য বছরের শুরুটা ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বছরের শুরুতে প্রায় ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু আগস্ট মাসের পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা এবং ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে অর্ডার প্রবাহে ধীরগতি নেমে আসে। বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ বলছেন, মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় বৈশ্বিক বাজারে বিক্রির হার কমে গেছে। কেবল ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, প্রায় সব দেশেই এখন একই অর্থনৈতিক স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে শিল্প মালিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বন্দরের জটিলতাও বর্তমানে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।

এত কিছুর পরও জুনে যে পরিসংখ্যানটি সামনে এসেছে তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। জুনে তৈরি পোশাক খাত থেকে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সব মিলিয়ে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে, যা মাসিক আয়ের হিসেবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এই ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং আমাদের রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলগুলো আয়ত্ত করে নিয়েছেন। যদিও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত খরচ উৎপাদন খরচকে বাড়িয়ে দিয়েছে, তবুও শেষ মাসে রপ্তানির এই উত্থান এক নতুন গতি সঞ্চার করেছে।

বাণিজ্যের এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি আয় ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একক দেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল মাইলফলক। এটি নির্দেশ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশেও বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা এখনো অটুট। চট্টগ্রাম বন্দরের হ্যান্ডলিং সংক্রান্ত তথ্যাদিও এই বাণিজ্যের প্রসারের সত্যতা নিশ্চিত করে। কন্টেইনার, কার্গো এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের হার বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো দেশের আমদানি-রপ্তানি কর্মকাণ্ড সচল রয়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিধারা স্থবির হয়ে পড়েনি। বন্দর কর্তৃপক্ষের এই দক্ষতা বজায় রাখা গেলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিজিএমইএ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। কীভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। রপ্তানি বাণিজ্যের এই চ্যালেঞ্জগুলোকে কেবল সংকট হিসেবে না দেখে, বরং তা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করাই এখনকার প্রধান কাজ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো, পণ্যের মানের বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, অর্থনীতির পথচলা কখনোই মসৃণ নয়, তবে প্রতিকূলতা জয় করার সক্ষমতাই একটি জাতির অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে মজবুত করে। গত অর্থবছরে আমরা যেসব বাধার সম্মুখীন হয়েছি, তা মোকাবিলা করার শিক্ষাই আমাদের আগামী দিনের পথচলায় সাহস জোগাবে। জুন মাসের সেই উজ্জ্বল পরিসংখ্যান এক দৃঢ় বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ তার রপ্তানি সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পথে। সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং শ্রমিক—এই তিন শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকলে বিশ্বমন্দার প্রভাব কাটিয়ে বাংলাদেশ আবারও রপ্তানির জোয়ারে ভাসবে। চ্যালেঞ্জের পাহাড় পেরিয়ে এই ঘুরে দাঁড়ানোই নতুন বছরের নতুন আশা, যা আমাদের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত