প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরির মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের অবিসংবাদিত নেতা, মহান বিপ্লবের ধারক আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে কেবল ইরানই নয়, কাঁদছে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব। এই মহান নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার জানাজায় অংশ নিতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল এখন ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন। এই প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও রয়েছেন। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তারা তেহরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বরাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত জানান, তেহরানের গ্র্যান্ড মুসল্লা এলাকাটি এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নেতাদের উপস্থিতিতে এক শোকাবহ কিন্তু শান্ত পরিবেশে পরিণত হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মরদেহ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য সেই গ্র্যান্ড মুসল্লায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের এই প্রতিনিধিদল সেখানে উপস্থিত হয়ে মরহুমের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যুতে বিশ্বের এত বড় সংখ্যক নেতার উপস্থিতিই প্রমাণ করে, ব্যক্তিগত জীবনে ও রাজনৈতিক আদর্শে খামেনি কতটা জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ছিলেন।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মূল জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা ও শোক যাত্রার মধ্য দিয়ে তাকে তার জন্মস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এবং আগামী ৯ জুলাই সেখানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। দীর্ঘ সময়ের এই আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল শনিবার জানাজায় অংশগ্রহণ সম্পন্ন করেই দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই শোকের মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকতে পেরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গভীর আবেগ ও শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এমন এক মহান ব্যক্তিত্বকে শেষবারের মতো দেখা এবং তার জানাজায় অংশ নেওয়া এক বিরল সম্মানের বিষয়।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ইরানের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দেশটির প্রতিটি সংকটে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় তিনি শাহাদতবরণ করেন। তার এই শাহাদাত ইরানসহ সারা বিশ্বের স্বাধীনতা প্রিয় মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছে। ৮৬ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও সংগ্রাম মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরূক হয়ে থাকবে। তার প্রয়াণে বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও নানা ধরনের বিশ্লেষণ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
জানাজায় অংশ নেওয়া আন্তর্জাতিক নেতাদের এই সমবেত হওয়া কেবল একটি শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ঐক্যের এক প্রতীকও বটে। তেহরানের আকাশ-বাতাস এখন শোকের গানে মুখরিত। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানিয়েছেন, সেখানকার পরিবেশ অত্যন্ত গম্ভীর এবং প্রতিটি মানুষের চোখে শোকের অশ্রু। ইরানের জনগণ তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে কতটা ব্যথিত, তা তাদের কান্নার শব্দেই ফুটে উঠছে। এমন একজন নেতার মৃত্যুতে কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষতি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এক মহান আদর্শিক অভিভাবককে হারানোর হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে। প্রতিনিধিদলটি ইরানের এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংহতি ও সমবেদনা জানিয়েছেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে এই সফর বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শোকের এই দিনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ সবসময়ই বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর দুঃসময়ে পাশে থাকার নীতিতে বিশ্বাসী। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা ইরানের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, আয়াতুল্লাহ খামেনির দেখানো পথ ও তার শিক্ষা আগামী প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার শাহাদাত বরণ কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং তার আদর্শিক সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় পরিণতি।
এই সফরের মধ্য দিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা যে মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন, তা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতিকেই প্রতিফলিত করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই প্রতিনিধিত্ব এবং মানবিক ও নৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তেহরান থেকে ফিরে আসার পর প্রতিনিধিদলটি খামেনির জীবনের ওপর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও শোকাবহ স্মৃতির বিষয়ে গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে ইরানের জনগণের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের প্রার্থনা ও সহমর্মিতা অটুট থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।
পরিশেষে বলা যায়, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণে এক যুগের সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু তার শাহাদাতের ঘটনা এবং তার প্রতি জানাজায় অংশ নিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ বিশ্বের নেতারা যে ঐকবদ্ধতা দেখালেন, তা দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শোকের এই দিনে আমরাও মহান এই নেতার আত্মার শান্তি ও শাহাদাত কবুলের প্রার্থনা করি। ইতিহাস সাক্ষী দেবে, তার সংগ্রাম ও সাহস ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন যুদ্ধের প্রতীক। আমরা বিশ্বাস করি, তার আদর্শ ইরানের মাটিকে এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষকে সবসময় প্রেরণা জোগাবে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এই সফর কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।