প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার ভোরে রডবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের বিলে উল্টে পড়লে প্রায় আট টন রডের নিচে চাপা পড়েন তিন শ্রমিক। মৃত্যু ও জীবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শ্রমিকদের হাড়কাঁপানো আর্তনাদ আর উদ্ধারকর্মীদের প্রাণপণ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরেছেন তারা। ভোর ৫টা ৩০ মিনিটের দিকে বড়উঠান ডাকপাড়া এলাকায় শরাফত অ্যান্ড ব্রাদার্স পেট্রল পাম্পের সামনে ঘটা এই দুর্ঘটনাটি স্থানীয়দের মনে গভীর আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। প্রতিদিন যে রাস্তা দিয়ে শত শত মানুষ যাতায়াত করেন, সেই পথই যেন মুহূর্তের মধ্যে এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল।
ঘটনার দিন সকালে চট্টগ্রাম শহর থেকে কেএসআরএমের মালিকানাধীন একটি ট্রাক আট টন রড নিয়ে আনোয়ারার দিকে যাত্রা করেছিল। ট্রাকটি বড়উঠান ডাকপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর পরপরই চালক ব্রেক করতে গিয়ে বুঝতে পারেন সেটি কাজ করছে না। ব্রেক বিকল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি টের পাওয়ার পর ট্রাকের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান চালক। মুহূর্তের মধ্যে ট্রাকটি সড়ক থেকে ছিটকে পাশের গভীর বিলে উল্টে পড়ে। বিলের পানিতে ট্রাকের ভারী বডি এবং তার ওপর থাকা আট টন রডের বিশাল স্তূপ পড়ার সাথে সাথেই এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে চালক ও তার সহকারী নিজেদের উপস্থিত বুদ্ধিতে ট্রাক থেকে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও, পেছনে রডের স্তূপের ওপর বসে থাকা তিন হতভাগ্য শ্রমিক সেই ভারের নিচে আটকা পড়ে যান।
আহত শ্রমিকদের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন বাঁশখালী উপজেলার আক্তার হোসেন, হামিরচর এলাকার রাসেল এবং কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বাহাদুর। দুর্ঘটনার পর তারা রডের স্তূপের নিচে পিষ্ট হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং দ্রুত কর্ণফুলী মডার্ন ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর এক রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযানের সূচনা হয়। রডের স্তূপের গভীরতা এবং বিলের কর্দমাক্ত পরিস্থিতি উদ্ধারকারীদের কাজকে বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। প্রায় ১৫ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর প্রচেষ্টায় অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা একে একে ওই তিন শ্রমিককে রডের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
উদ্ধারের পরপরই আহত শ্রমিকদের গুরুতর অবস্থায় স্থানীয় আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দায়িত্বরত চিকিৎসকরা দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। চমেক হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রডের নিচে চাপা পড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পাওয়ায় এবং ভারী ওজনের চাপে তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বেশ নাজুক বলে জানা গেছে। আহতদের স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। তারা কেবলই প্রার্থনা করছেন যেন শ্রমিকরা দ্রুত সুস্থ হয়ে কর্মজীবনে ফিরে আসতে পারেন।
কর্ণফুলী মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রডগুলো সরিয়ে চাপা পড়া তিনজনকে উদ্ধার করেছি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকটিকে বিল থেকে তুলে সড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের এই তৎপরতা না থাকলে হয়তো পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়ত। এদিকে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার উদ্দিন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার ঘটনার পর পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ট্রাকের যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল নাকি কোনো অবহেলার কারণে ব্রেক বিকল হয়েছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারী মালামাল পরিবহনকারী ট্রাকগুলোর ফিটনেস ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মালিকদের অবহেলা প্রায়শই এমন মর্মান্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আগে নিয়মিত ব্রেকসহ অন্যান্য যান্ত্রিক অবস্থা পরীক্ষা না করা এক গুরুতর অপরাধ। একজন শ্রমিকের সামান্য অসতর্কতায় বা মালিকের অবহেলায় আজ এই তিন পরিবার এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে পালন করা এবং ভারী যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, দুর্ঘটনায় কবলিত শ্রমিকদের উদ্ধার করে জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও, তাদের এই শারীরিক ও মানসিক আঘাতের ক্ষত সারতে দীর্ঘ সময় লাগবে। যারা বেঁচে ফিরেছেন, তারা এখন সুস্থতার দিকে এগিয়ে চলছেন, এটাই বড় সান্ত্বনা। এই ঘটনাটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করা উচিত যাতে সড়ক ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুরক্ষা বজায় রাখা হয়। আমরা আশা করি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা সতর্ক হই, তবেই এমন অপমৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব হবে। আহত শ্রমিকদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে সচেতন মহলের দাবি, সড়ক নিরাপত্তা রক্ষায় এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।