সুখরঞ্জন বালি গুম: ডিবি পুলিশের জালে এক পুলিশ কর্মকর্তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ১০ বার
সুখরঞ্জন বালি গুম: ডিবি পুলিশের জালে এক পুলিশ কর্মকর্তা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসা সুখরঞ্জন বালির রহস্যজনক অন্তর্ধান। দীর্ঘ এক যুগ পর সেই চাঞ্চল্যকর গুমের ঘটনার রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর একটি বাসা থেকে ফজলুর রহমান নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা ছিলেন। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রায় এক যুগ আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ংকর ঘটনার নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলো, যা দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় ২০১২ সালে, যখন জামায়াতের প্রয়াত নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সুখরঞ্জন বালি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এসেছিলেন। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের প্রাঙ্গণ থেকে তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। সেই সময় বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সুখরঞ্জন বালি ফিরে এসে জানান, তাকে গুম করে ভারতের একটি কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এই গুমের ঘটনা কেবল একজন সাধারণ ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার কাহিনী নয়, বরং এটি ছিল বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার এবং সাক্ষীদের মুখ বন্ধ করার এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।

সুখরঞ্জন বালির দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ ধাপে গত বছরের ২১ আগস্ট তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। নিজের ওপর চালানো গুম, অপহরণ এবং অমানুষিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি পিরোজপুরের এক সাধারণ কৃষক থেকে কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হলেন, তা তুলে ধরেন। ওই অভিযোগে তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ মোট ৩২ জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। সুখরঞ্জন বালির অভিযোগ ছিল, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ট্রাইব্যুনালে সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এলে তাকে গুম করে দেওয়া হয়।

গ্রেপ্তারকৃত পুলিশ কর্মকর্তা ফজলুর রহমান এই গুমের ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত কি না, তা নিয়ে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ওই কর্মকর্তার বর্তমান কর্মস্থল বা পদমর্যাদার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেননি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে মামলার গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে এবং সেই সময়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যাবে। বহু বছর ধরে যারা এই গুম ও নির্যাতনের নেপথ্যে ছিলেন, তাদের মুখোশ উন্মোচনের এটাই সম্ভবত উপযুক্ত সময়।

সুখরঞ্জন বালির জীবনগাথা এক করুণ উপন্যাসের মতো। পিরোজপুরের সামান্য একজন মানুষ হয়েও তিনি যেভাবে দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারতের অন্ধকার কারাগারে বন্দি ছিলেন, তা এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত। দেশে ফিরে আসার পর তিনি যে লড়াই শুরু করেছিলেন, তা ছিল অকুতোভয়। ট্রাইব্যুনালের সেই ঘটনার সময় তাকে যেভাবে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে ডিবি পুলিশ অবশেষে ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলো। এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশীরা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছেন।

মানবাধিকার রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বদ্ধপরিকর। সুখরঞ্জন বালির ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্যাতন নয়, বরং এটি দেশের আইনি ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত ছিল। ট্রাইব্যুনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে সাক্ষীকে গুম করার দুঃসাহস কেবল রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরাই দেখাতে পারত। এখন যেহেতু ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে এবং অভিযুক্তরা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে, তাই আশা করা যাচ্ছে যে, এই ঘটনার পেছনে যারা মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, তাদেরও পরিচয় বেরিয়ে আসবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই গ্রেপ্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হিসেবে গণ্য হবে।

সুখরঞ্জন বালির এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লড়াইয়ের সাফল্য এখন দেশের প্রতিটি মানুষের নজর কেড়েছে। একজন সাক্ষী বা সাধারণ নাগরিককে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এভাবে বছরের পর বছর গুম করে রাখার যে সংস্কৃতি গত দেড় দশকে গড়ে উঠেছিল, তার পতন হওয়ার সময় এসেছে। কেবল ফজলুর রহমান নন, বরং যারা সেই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদের সবার বিচার হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র যেন নিশ্চিত করে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো সাক্ষী বা নাগরিককে এভাবে নিজ দেশে বা বিদেশের মাটিতে গুম হতে না হয়। আইনের সামনে সবাই সমান—এই আপ্তবাক্যটি যেন বাস্তবে রূপ পায়।

পরিশেষে বলা যায়, সুখরঞ্জন বালির গুম ও নির্যাতনের ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। এই অধ্যায় মুছে ফেলার জন্য সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি অনিবার্য। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচারের যে জয়যাত্রা শুরু হলো, তা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে পূর্ণতা পাক—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। সত্যের জয় নিশ্চিত এবং গুম-সংস্কৃতির অবসান ঘটানোই হোক আমাদের আগামীর লক্ষ্য। দীর্ঘ ১২ বছর পর হলেও সুখরঞ্জন বালি আজ যে সাহসের সঙ্গে তার ওপর নির্যাতনের বিচার চেয়েছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের চোখে সে অপরাধী—এই বার্তাই এখন দেশের প্রতিটি মানুষ শুনতে চায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত