অনলাইনে সিসা ব্যবসা: দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ চালান জব্দ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৯ বার
অনলাইনে সিসা ব্যবসা: দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ চালান জব্দ

প্রকাশ: ৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক অকুতোভয় অভিযানে ধরা পড়ল ডিজিটাল যুগে মাদকের এক নতুন ও ভয়াবহ সিন্ডিকেট। রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকার বিভিন্ন স্থানে চালানো এক নিখুঁত অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৬৬ কেজি সিসা, ৪১টি হুক্কা এবং বিপুল পরিমাণ সিসা সেবনের সরঞ্জাম। দেশের ইতিহাসে সিসা আটকের ক্ষেত্রে এটিই সর্ববৃহৎ চালান বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই অভিযানে গ্রেফতার করা হয়েছে তিনজনকে, যাদের মধ্যে দুইজন ইরানি বংশোদ্ভূত সহোদর এবং অন্যজন তাদের অন্যতম সহযোগী। ভার্চুয়াল জগতের আড়ালে যারা দিনের পর দিন বিষ ছড়িয়ে আসছিল, তাদের এই গ্রেফতার মাদকবিরোধী যুদ্ধে এক বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে দুই সহোদর হলেন আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি এবং অপরজন মো. মাকসুদ আলম। শুক্রবার সেগুনবাগিচায় ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃত দুই সহোদর বাংলাদেশে বসবাস করলেও তাদের পূর্বপুরুষ ইরানি। তারা দীর্ঘদিন ইরানে অবস্থান করার সময় সিসা ব্যবসার আন্তর্জাতিক কৌশল, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণের খুঁটিনাটি রপ্ত করে দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে তারা সেই কৌশলী ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহার করে বাংলাদেশে সিসা বিক্রির এক বিশাল অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই চক্রটি একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাদের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করত। অনলাইনে পণ্যের ছবি আপলোড, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্ডার গ্রহণ এবং বিকাশের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে লেনদেন—সবকিছুই হতো অত্যন্ত গোপনীয়তায়। তারা এতই সুচতুর ছিল যে, লেনদেনের জন্য একাধিক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করত, যাতে অর্থের উৎস ও প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় ধামাচাপা দেওয়া যায়। ফেসবুকের এই পেজটি ছিল বাংলাদেশে সিসা বিক্রির অন্যতম প্রাচীন ও সক্রিয় প্ল্যাটফর্ম। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দেশীয় নামকরা কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে গ্রাহকদের ঠিকানায় সিসা ও হুক্কা পৌঁছে দিত, যা প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে চলা তাদের জন্য সহজতর করেছিল।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির একটি বিশেষ টিম গত ২ জুলাই অভিযান শুরু করে। প্রথমে বসুন্ধরা ও মালিবাগ এলাকায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো দুটি পার্সেল থেকে এক কেজি করে মোট দুই কেজি সিসা জব্দ করা হয়। সেই পার্সেলের প্রেরকের ঠিকানা যাচাই করে গোয়েন্দারা গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে হানা দেন। সেখানে উপস্থিত আহমেদ ও মেহদাদ শরীফিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তাদের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয় আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করে যে, সরবরাহের একটি বড় অংশ আসত মাকসুদ আলম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা এলাকার নূরেরচালায় বসবাস করেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই রাতে মাকসুদকে আটক করা হয় এবং সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা।

এই চক্রটির কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল না, বরং তাদের জাল ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। অভিযানে জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস ও মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্যে একটি বিশাল গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ নিয়মিত তাদের কাছ থেকে সিসা ও এর উপকরণ কিনত। নিয়মিত ক্রেতা, ডিলার এবং এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করতে এখন ডিজিটাল ফরেনসিক ও তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ডিএনসি মনে করছে, এই ডাটাবেস থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো ভবিষ্যতে মাদকবিরোধী অভিযানে আরও বড় সাফল্যের দরজা খুলে দেবে।

সিসা সেবন বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে এক ধরনের ফ্যাশন হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে, যার পেছনে রয়েছে এই ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের প্ররোচনা। হুক্কার মাধ্যমে সিসা সেবন যে শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা জেনেই এই চক্রটি মুনাফালোভী হয়ে উঠেছিল। তাদের লক্ষ্যই ছিল তরুণ প্রজন্মকে বিষাক্ত এই মাদকের দিকে ঠেলে দেওয়া। তারা এমন এক মডেল তৈরি করেছিল, যেখানে ক্রেতাকে ঘরে বসেই মাদক পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হতো। তাদের এই অনলাইন শপিং মডেলটি মাদকসেবীদের জন্য ছিল খুবই সহায়ক। প্রশাসনের এই অভিযানে সেই ভয়ংকর নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে অভিভাবক ও সচেতন মহলে স্বস্তি নিয়ে আসবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই অভিযানটি প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা যতই ডিজিটাল কৌশলী হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি থেকে তাদের রক্ষা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির আর্থিক লেনদেনের উৎস ও নেটওয়ার্কের প্রতিটি সদস্যকে খুঁজে বের করার যে প্রক্রিয়া ডিএনসি শুরু করেছে, তা নজিরবিহীন। সিসা কোনো সাধারণ তামাকপণ্য নয়, বরং এটি একটি বিপজ্জনক মাদক, যা তরুণদের মস্তিষ্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। এমন ভয়াবহ মাদকের ব্যবসা রোধে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, সর্ববৃহৎ এই সিসার চালান জব্দ করার ঘটনা মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিরই প্রতিফলন। গ্রেফতারকৃত তিনজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। কেবল মাদক উদ্ধারের মাধ্যমেই দায় শেষ নয়, বরং এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। মাদক সিন্ডিকেটের এই জাল ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে আমরা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এক মাদকমুক্ত যুবসমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি। আমাদের প্রতিটি নাগরিকের উচিত এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক কার্যক্রম দেখলে প্রশাসনকে দ্রুত অবহিত করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত