এলপি গ্যাসের দাম কমলেও বাজারে নেই স্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
এলপি গ্যাসের দাম কমলেও বাজারে নেই স্বস্তি

প্রকাশ: ৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) যখনই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম কমানোর ঘোষণা দেয়, তখন দেশের সাধারণ মানুষের চোখেমুখে এক চিলতে স্বস্তির আভা ফুটে ওঠে। কিন্তু সেই স্বস্তি বাস্তবতার কষ্টিপাথরে এসে যেন প্রতিদিন মুখ থুবড়ে পড়ছে। গত বৃহস্পতিবার কমিশন ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। টানা দুই মাস দাম কমানোর এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু ঘোষণার কালি শুকানোর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা গেল এক হতাশাজনক চিত্র। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে ৭০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত এই সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাস যেন এখন বাজারের অলিগলিতে এক অলীক স্বপ্নের মতো।

রাজধানীর বসিলা এলাকা থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা দোকানগুলোতে গেলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সরকার যখন ঘোষণা দেয় যে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫২৮ টাকা, তখন দোকানে গিয়ে ভোক্তারা শোনেন সেই চড়া দামের অভিন্ন সুর। কোথাও ১ হাজার ৬০০, কোথাও ১ হাজার ৭০০ আবার কোথাও ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে একই সিলিন্ডার। গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়ে দায় সারে, কিন্তু সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ে নেই। ফলে ঘোষিত এই মূল্যতালিকা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী ক্রেতারা প্রশ্ন তুলছেন, সরকার কেন নিয়মিত তদারকি করে না? কেন অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম কমার সুফল সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে?

এই অতিরিক্ত দাম নেওয়ার পেছনে খুচরা ব্যবসায়ীদের রয়েছে নিজস্ব নানা যুক্তি। দোকানিদের মতে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়ান না। তাদের দাবি, নতুন দামের সিলিন্ডার এখনো তাদের গুদামে পৌঁছায়নি; তারা আগের বেশি দামে কেনা চালানের মাল এখনো বিক্রি করছেন। এছাড়া পরিবহন খরচ, গুদামজাতকরণের ভাড়া, শ্রমিক মজুরি এবং গ্রাহকের বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার খরচ সব মিলিয়ে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা তাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের এই ভাষ্য অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে যে দাম নির্ধারণ করা হয়, তাতে হয়তো অনেক সময় পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে তারা বাধ্য হয়েই বাড়তি টাকা যোগ করে দাম ধার্য করেন। তবে এই যুক্তি ক্রেতাদের ক্ষোভ কমাতে পারছে না। তাদের মতে, সরকারি দামের ওপর ভিত্তি করেই ব্যবসা পরিচালিত হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তব চিত্রটি এখানে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই হয় না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকি ব্যবস্থা থাকা জরুরি। যখন বিইআরসি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে, তখন স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা কেন সেই অনুযায়ী বিক্রি করবেন না—এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে বাজার চলতে পারে না। যখনই কোনো পণ্য জনসাধারণের মৌলিক চাহিদার সাথে যুক্ত হয়, তখনই অসাধু ব্যবসায়ীরা তা নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ পায়। এলপি গ্যাসের ক্ষেত্রেও ঠিক এই কাজটিই ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় ডিলাররা আগেই বেশি দামে সিলিন্ডার মজুদ করে রাখেন, যা পরে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি মুনাফা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সাধারণ মানুষ আজ চরম অসহায়ত্বের শিকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে গ্যাসের দামের এই কারসাজি তাদের পারিবারিক বাজেটে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যারা সীমিত আয়ে সংসার চালান, তাদের জন্য অতিরিক্ত ৩০০ টাকা ব্যয় করা মানে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হিমশিম খাওয়া। ক্রেতাদের দাবি, সরকার যদি সত্যি সত্যিই জনগণের স্বস্তি নিশ্চিত করতে চায়, তবে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষ করে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। কোনো ব্যবসায়ীই যেন সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো দাম নিতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। কেবল প্রশাসনিক ভয়ই পারে এই অসাধু চক্রকে নিয়ন্ত্রণে আনতে।

প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইন ও ডাটাবেসের মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ করা কঠিন কিছু নয়। ডিএনসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিত ডিলারদের স্টক এবং বিক্রয়মূল্য মনিটর করতে পারে, তবে এই নৈরাজ্য অনেকাংশেই কমে আসবে। পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। সরকার নির্ধারিত দামের বেশি চাইলে তারা যেন দ্রুত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানান। তবে সাধারণ নাগরিকের একার প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সরকারি তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রতিটি মাসের দাম ঘোষণার পর একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা প্রাপ্তি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। এলপি গ্যাসের দাম কমানোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে, যখন প্রতিটি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামে প্রতিটি রান্নাঘরে পৌঁছাবে। বাজার তদারকি ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা তৈরির মাধ্যমেই এই স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকার ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে দেশের এলপি গ্যাস বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে কর্তৃপক্ষ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভোক্তারা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত