খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া: ছয় দিনের ঐতিহাসিক বিদায় পর্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া: ছয় দিনের ঐতিহাসিক বিদায় পর্ব

প্রকাশ:  ০৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও আড়ম্বরপূর্ণ বিদায় আয়োজনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তেহরান। গত চার মাস আগে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ে নেওয়া হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ। আগামী শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া ছয় দিনব্যাপী এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ইরানি কর্মকর্তারা অভিহিত করছেন ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ হিসেবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠান কেবল একজন নেতার শেষ যাত্রা নয়, বরং এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রাজনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় প্রভাব এবং ক্ষমতার কাঠামোর এক বিশাল প্রদর্শনী। তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় শুরু হওয়া এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে তার জন্মশহর মাশহাদে গিয়ে, যা সমগ্র বিশ্বকে ইরানের ঐক্য ও স্থিতিশীলতার এক বিশেষ বার্তা দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল আয়োজন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। অনুমান করা হচ্ছে, এই অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে, যা ইরানের ইতিহাসে যেকোনো অনুষ্ঠানের তুলনায় সবচেয়ে বড় জনসমাগম। পুরো কার্যক্রমটি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অধীনস্থ মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে পথে পথে তৈরি করা হয়েছে হাজারো ‘মাওকিব’ বা সেবাকেন্দ্র। এছাড়া বিদেশি অতিথিদের আগমন এবং অভ্যন্তরীণ দর্শনার্থীদের থাকার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসন ব্যবস্থা। ইরানের রাষ্ট্রীয় এই আয়োজনকে ঘিরে যে নিবিড় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, তা বিশ্বরাজনীতিতে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

আগামী শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় শুরু হবে শ্রদ্ধা নিবেদনের মূল পর্ব। রোববার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয় নেতার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। কফিনটিকে একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে, যেখানে দর্শনার্থীদের আসা-যাওয়ার পথ এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন প্রতিটি মানুষ অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন সম্পন্ন করতে পারেন। আয়োজকদের লক্ষ্য হলো, কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই বিশাল জনস্রোতকে সামাল দেওয়া। শিয়া ঐতিহ্যে শোকের আবহে মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’ স্লোগানকে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল প্রতীক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সমর্থকদের আবেগকে আরও উসকে দিচ্ছে।

মঙ্গলবার এই আনুষ্ঠানিকতা স্থানান্তরিত হবে কুম শহরে। সেখানকার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেমগণ ইমামতি করবেন। এই জানাজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ইরানের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক শক্তির এক অনন্য মিলনস্থল। এরপর বুধবার মরদেহের গন্তব্য হবে ইরাকের নাজাফ। অন্ত্যেষ্টিযাত্রার পর কারবালায় ইসলামের খলিফা আলীর সমাধিস্থলে শোকাবহ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিশেষ অনুরোধে এই আন্তর্জাতিক রুটটি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শিয়াশাসিত মুসলিম বিশ্বে ইরানের গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবকে আরও সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। এই সফরটি কেবল আবেগীয় নয়, বরং প্রতীকী দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পরিশেষে ৯ জুলাই খামেনির জন্মশহর মাশহাদে ইমাম রেজার পবিত্র সমাধিস্থলে তাকে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের এই সমাধিস্থল ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র স্থান। দাফনের পর পরবর্তী ৪০ দিন ধরে সারা দেশে শোকানুষ্ঠান পালিত হবে এবং প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত চলবে বিভিন্ন স্মরণসভা। এই দীর্ঘমেয়াদী শোক কর্মসূচি প্রমাণ করে যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল একজন নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ইরানের আদর্শিক স্তম্ভ। তার এই শেষ বিদায়ে কেবল ইরানি নাগরিকরাই নন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রপ্রধান ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা সমবেত হচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারও রয়েছেন। প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ সারা বিশ্বে সরাসরি সম্প্রচার করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া খামেনিপূর্ব ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করার এক কৌশলী উপায় হতে পারে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতাদের শেষ বিদায় মানেই এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন। এই বিশাল জনসমাগমের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে ছাপিয়ে এক ঐক্যের বার্তা দিতে চাইছে। পাশাপাশি আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জোরালো করার বিষয়টিও এই আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। তবে সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত থেকে গেছে। বিশেষ করে মোজতবা খামেনি ও তার পরিবারের উপস্থিতি এবং জানাজার নামাজে কে ইমামতি করবেন—এই বিষয়গুলো ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এই বিদায় পর্ব কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যুতে শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ইরানের জাতীয় পরিচয় ও আদর্শের এক বিশাল সম্মেলন। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ইরান প্রমাণ করতে চায় যে তারা অটল ও ঐক্যবদ্ধ। তবে এই বিশাল আয়োজন শেষে ইরানি সমাজ ও রাজনীতি নতুন কোন পথে এগোবে, সেটাই দেখার বিষয়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই মহাপ্রয়াণ কি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মুছে ফেলে নতুন কোনো নেতৃত্বের হাত ধরে উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করবে, নাকি জটিল রাজনীতির গোলকধাঁধায় নতুন কোনো সংকটের জন্ম দেবে—তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে তেহরানের সেই ছয় দিনের ঐতিহাসিক বিদায় পর্বের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত