ন্যাটো সম্মেলন ঘিরে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ ও অনিশ্চয়তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
ন্যাটো সম্মেলন ঘিরে বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ ও অনিশ্চয়তা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে ন্যাটোর গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু বর্তমান সময়ে এই জোটটি দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। আগামী সপ্তাহে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ন্যাটোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক শীর্ষ সম্মেলন। স্বাভাবিক সময়ে এই সম্মেলনে জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও, এবার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং তার প্রভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া অস্বস্তি সম্মেলনকে ঘিরে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতির অস্পষ্টতা, অন্যদিকে ইউরোপীয় জনমতের প্রবল বিরোধিতা—এই দুইয়ের চাপে ন্যাটোর ঐক্য আজ এক গভীর সংকটের মুখে।

সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক রণকৌশল এবং ইউরোপীয় নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপকে ইউরোপের অনেক দেশ খোলা মনে সমর্থন করতে পারছে না। অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্রে এই যুদ্ধ ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও অজনপ্রিয়তার জন্ম দিয়েছে। অথচ ন্যাটোর সদস্য হিসেবে অধিকাংশ দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের আকাশসীমা এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। ইতালি, ব্রিটেনসহ ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্কের টানাপোড়েন আঙ্কারা সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকটা ‘বিবাহ-পরামর্শদাতার’ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্মেলনকে মূল এজেন্ডায় ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। রুটের মতে, শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য হলো ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা। বার্লিনের এক অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ন্যাটো একটি আন্তঃআটলান্টিক জোট হিসেবে তার অস্তিত্ব বজায় রাখবে, তবে এখন থেকে ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডাকে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হবে। এটি কেবল একটি পরামর্শ নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অনীহার মুখে ন্যাটোর টিকে থাকার নতুন শর্ত।

প্রতিরক্ষা ব্যয়ের হিসাব নিকাশও এখন জোটের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কারণ। গত বছর ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো এবং কানাডা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে ৯০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করেছে, যার ফলে মোট ব্যয় ৫৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছরের দ্য হেগ শীর্ষ সম্মেলনে নেতারা ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন, তা অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইউরোপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল ব্যয় কি কেবল অস্ত্রের মজুত বাড়াবে, নাকি তা সত্যিই কার্যকর সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তরিত হবে? ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আঙ্কারা সম্মেলন শুরু হতেই ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষোভ এবং ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার নিয়ে তার সাম্প্রতিক কঠোর মন্তব্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ইউরোপের পর্যাপ্ত সামরিক সহায়তার অভাব থাকলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহায়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের থাকতে পারে না। এই বক্তব্য ন্যাটোর মূল ভিত্তি ‘একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ’—এই নীতির প্রতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যাটোর কর্মকর্তারা অবশ্য আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, অনেক ইউরোপীয় নেতা যুদ্ধ সমর্থন না করলেও জোটের মর্যাদা রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। তবুও আঙ্কারার সম্মেলন কক্ষে যখন রাষ্ট্রপ্রধানরা মুখোমুখি হবেন, তখন এই কূটনৈতিক ও সামরিক আস্থার সংকট স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, ন্যাটো আজ এক অদ্ভুত দোটানায় পড়েছে। ইউরোপের সাধারণ মানুষ যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি চায়, অথচ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় তাদের সরকারগুলোকে সামরিক শক্তির মহড়া দিতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আবারও নতুন করে জ্বলে ওঠে, তবে তা ইউরোপের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। আঙ্কারা সম্মেলনে নেতারা যদি পারস্পরিক এই অবিশ্বাস ও কৌশলগত দূরত্ব কমিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে আসতে ব্যর্থ হন, তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এই সামরিক জোটের ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদী ফাটলের সূচনা করতে পারে। ন্যাটোর নীতিনির্ধারকরা জানেন, কোনো ভুল পদক্ষেপ বা ভুল বোঝাবুঝি পুরো ইউরোপ ও আটলান্টিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, আঙ্কারা সম্মেলন কেবল নেতাদের মিলনমেলা নয়, এটি একটি পরীক্ষা—ন্যাটো কি তার অস্তিত্ব ও ঐক্য বজায় রাখতে পারবে, নাকি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে ভেঙে পড়বে? ইরান সংঘাতের যে ছায়া এখন সম্মেলনের ওপর পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের উপায় ন্যাটোর নেতৃত্বের হাতেই। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী নীতি এবং অন্যদিকে ইউরোপের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই—এই দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মহাসচিব মার্ক রুটের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এখন আঙ্কারার দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও সামরিক জোটের ভাগ্য। সংঘাত ও অনিশ্চয়তার এই উত্তাল সময়ে ন্যাটোর প্রতিটি সিদ্ধান্তই হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত