ভোলা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৭ বার
ভোলা রক্ষায় ৬৮৫ কোটি টাকার প্রকল্প

প্রকাশ: ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মহাস্রোতস্বিনী মেঘনা নদীর এক বুক চিরে চলা বিধ্বংসী ও সর্বগ্রাসী ভাঙনের হাত থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার অবহেলিত শিবপুর, ধনিয়া এবং মেদুয়া এলাকাকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করার জন্য সর্বমোট ছয়শত পঁচাশি কোটি ছিয়াশি লাখ টাকার একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জনগুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আগামীকালের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বা একনেক সভায় উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ সরকারি নিজস্ব তহবিল বা জিওবির অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নদীভাঙনের ভয়াল থাবা থেকে জনপদ রক্ষা করা, উপকূলীয় দুর্বল বাঁধগুলোর টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, বাঁধের ঢাল রক্ষা এবং আধুনিক পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার স্থায়ী ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা। তবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মেঘনার সর্বগ্রাসী ভাঙন থেকে ভোলা জেলার এই জনপদকে রক্ষা করার এই প্রকল্পটি একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য টেবিলে উত্থাপনের পূর্বে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বা পিইসি এর বিভিন্ন কারিগরি ও আর্থিক দিক নিয়ে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কড়া আপত্তি উত্থাপন করেছিল। বিশেষ করে, নদী তীর সংরক্ষণের মতো একটি সীমিত পরিসরের কাজে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় নিয়ে কমিশনের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে প্রধানত আপত্তি তোলা হয়েছিল যে, মাত্র চার কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণের মতো কাজের জন্য পাঁচশ পাঁচ কোটি টাকারও বেশি অর্থ প্রাক্কলন করা অত্যন্ত অতিরিক্ত এবং অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে প্রকল্পের ব্যয় পুনরায় যাচাই-বাছাই করে তা হ্রাসের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের সেই নির্দেশনা ও পর্যালোচনার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েকটি অহেতুক বা অপ্রয়োজনীয় খাত ছাঁটাই করে এবং নামমাত্র কিছু খরচ কমিয়ে প্রাক্কলিত ব্যয় পাঁচশ তিন কোটি সাতাত্তর লাখ টাকায় নামিয়ে আনে। একই সঙ্গে উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ, প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ক্রয় পরিকল্পনা বা প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানের বিভিন্ন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে একটি পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি অতি দ্রুত পরিকল্পনা কমিশনে পুনরায় জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে একনেক সভার জন্য প্রস্তুত করা অত্যন্ত বিস্তারিত সারসংক্ষেপে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্বে থাকবে। চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু করে ২০৩০ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই পুরো প্রকল্পের নির্ধারিত মোট বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেকসই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

সরকারি ও দাপ্তরিক বিভিন্ন নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রমত্ত মেঘনা নদীর নির্মম ও সর্বগ্রাসী ভাঙনের কারণে প্রতি বছর ভোলা জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ও ধনিয়া ইউনিয়ন এবং দৌলতখান উপজেলার মেদুয়া ইউনিয়নের প্রায় চার কিলোমিটার সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নদীভাঙনের তীব্রতা এমন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে, অতি জোয়ারের প্রকোপ এবং বিভিন্ন সময়ে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ মাটির বাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে পোল্ডারের ভেতরের জনপদে সহজেই লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ফসলি জমি, গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ বাজার এবং সাধারণ মানুষের বসতভিটাসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র জলাবদ্ধতাও এক অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সার্বিক ও দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যই মূলত নদী তীর সংরক্ষণ, উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, ঢাল সুরক্ষা এবং দুটি আধুনিক পানি নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের অত্যন্ত সময়োপযোগী এই প্রস্তাবটি পেশ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হতে যাওয়া বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কাজের বিবরণ তুলে ধরে জানানো হয়েছে যে, এর মূল কাজের মধ্যে রয়েছে চার কিলোমিটার দীর্ঘ নদী তীর সংরক্ষণ, ছয় কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, পাঁচ দশমিক কুড়ি কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং দুটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো বা স্লুইস গেট নির্মাণ। সরকারের নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার জোরালো দাবি রয়েছে যে, এই সমস্ত বহুমুখী কাজ যদি সঠিকভাবে এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়, তবে এর মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার আটশ চার কোটি টাকার মূল্যবান সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা পাবে। পাশাপাশি প্রায় দুই হাজার দুশ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হবে এবং এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এছাড়া প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় পঁয়ষট্টি হাজার চারশ বাহাত্তর জন মানুষের বহুমুখী কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের একটি বিশাল ও সিংহভাগ অংশই ব্যয় হচ্ছে নদী তীর সংরক্ষণের অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় বাষ্পাত্তর থেকে তিয়াত্তর শতাংশের কাছাকাছি। পিইসি বা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির পূর্ববর্তী সভায় এই ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে চার কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণের জন্য পাঁচশ পাঁচ কোটি টাকার বেশি প্রাক্কলন কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এর জবাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে জানানো হয় যে, নির্দিষ্ট ওই প্রকল্প এলাকায় মেঘনা নদীর তীব্র স্কাওয়ার বা তলদেশ খাদের গভীরতা মাইনাস তেত্রিশ মিটার এবং নদীর পানির তীব্র প্রবাহ বা স্রোতের গতি প্রতি সেকেন্ডে তিন দশমিক শূন্য ছয় মিটার। এই চরম প্রতিকূল প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে সেখানে একটি স্থায়ী ও টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নদীর তলদেশে পঞ্চাশ থেকে সত্তর মিটার প্রশস্ত অ্যাপ্রন এবং প্রতি মিটারে পঁচানব্বই ঘনমিটার ডাম্পিং ভলিউমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর মধ্যে ঠিক অর্ধেক অংশে জিওব্যাগ এবং বাকি অর্ধেক অংশে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জোরালো প্রযুক্তিগত যুক্তি ছিল যে, এর চেয়ে কম পরিমাণ উপকরণ বা হালকা কাজ ব্যবহার করলে নদীর এই তীব্র ভাঙন কোনোভাবেই স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

নদী তীর সংরক্ষণ ছাড়াও পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় আরও বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে সংশোধনের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের আটশ মিটার দীর্ঘ বাঁধে ব্যয়বহুল কংক্রিট ব্লক ব্যবহার না করে কেবল জেসিন বা টার্ফিংসহ সাধারণ মাটির বাঁধ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া বাঁধ পুনর্বাসন কাজের ব্যয় এবং বাঁধের ঢাল সুরক্ষা কাজের ব্যয় সম্পূর্ণ আলাদাভাবে আলাদা খাতে প্রদর্শন করতে বলা হয়। প্রকৌশলগত কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি দুইশ থেকে আড়াইশ মিটার অন্তর প্রয়োজনীয় মাটির সঠিক পরিমাণ একটি ছক বা টেবিল আকারে উপস্থাপনের নির্দেশও প্রদান করা হয়েছিল। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন কাঠামো বা নিষ্কাশন গেট নির্মাণের মোট ব্যয় একত্রিশ কোটি টাকার একটি যৌক্তিক সীমার মধ্যে সীমিত রাখা, মূল্যস্ফীতি ও ভৌত কন্টিনজেন্সি মিলিয়ে অতিরিক্ত খরচ সর্বোচ্চ চল্লিশ লাখ টাকায় নির্ধারণ করা, প্রকল্প-পরবর্তী বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সাত কোটি ত্রিশ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন কোটি একষট্টি লাখ টাকায় নামিয়ে আনা এবং ক্রয় পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে সঠিক পদ্ধতি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা ও লাভজনকতা যাচাই করার জন্য ২০২৩ সালের মে মাসে প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং বা আইডব্লিউএম একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করে। ওই সমীক্ষার চূড়ান্ত সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই মূলত বর্তমান প্রকল্পটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রণয়ন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পরিচালিত বিস্তারিত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট বা হার ধরে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু বা এনপিভির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুইশ কুড়ি কোটি ৫০ লাখ টাকা, বেনিফিট-কস্ট রেশিও বা বিসিআর হলো এক দশমিক ছিপ্পান্ন এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার বা আইআরআর হলো ১৭ দশমিক পঁচাশি শতাংশ। এই সমস্ত আধুনিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর নিরিখে পরিকল্পনা কমিশন নিশ্চিত হয়েছে যে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে যথেষ্ট লাভজনক ও ফলপ্রসূ। যদিও এই ধরনের অবকাঠামোগত ও প্রতিরক্ষামূলক প্রকল্প থেকে সরাসরি কোনো প্রত্যক্ষ আর্থিক নগদ আয় আসবে না, তবুও সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য জোরালো সুপারিশ প্রদান করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত