ভারতের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা: হুমায়ুন কবির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
ভারতের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা: হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা বিষয়ে মতপার্থক্য ও সমস্যা থাকলেও প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে আলোচনার পথ সবসময় খোলা থাকবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগ, সংলাপ ও পারস্পরিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েই সামনে এগোতে চায় বাংলাদেশ।

শনিবার সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এবং চলমান বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে হাজারো সমস্যা থাকলেও ভারতের সঙ্গে আলোচনার দরজা কখনো বন্ধ করা হবে না। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য, অর্থনৈতিক যোগাযোগ, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থের মতো বহু বিষয় রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খুঁজে নিতে হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিয়মিত যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গেও এ সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত। ফলে কোনো একটি বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সেটি বৃহত্তর সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সংলাপের সুযোগ সচল রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি সব অংশীদারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এর আগেও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন, যদিও সে সফরের তারিখ তখনও নির্ধারণ করা হয়নি।

সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এর আগে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা আমন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি তখনও চূড়ান্ত হয়নি।

মক্কা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সমন্বিত এবং নমনীয় অবস্থান প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একটি সহযোগিতা কাঠামোয় যুক্ত হওয়া মানেই অন্য দেশ বা অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সীমিত হয়ে যাওয়া নয়।

মক্কা চুক্তির প্রসঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথাও সামনে এসেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল্যায়ন করা হয় বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগকে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়েও কথা বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করতে পারে। গরমের সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ এবং উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়—সবকিছুই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় দ্রুত সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের দিকে সাধারণ মানুষের নজর রয়েছে।

হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট—দুই ক্ষেত্রেই সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়টি উঠে এসেছে। একদিকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সংলাপের পথ খোলা রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ। বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ যেন প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বিবেচিত হয়—এমন প্রত্যাশাও রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মতপার্থক্যকে সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ হিসেবে দেখতে চায় না বাংলাদেশ। বরং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নীতিতেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

সিলেটে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হুমায়ুন কবির দেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে জটিলতা মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ভারতের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার বার্তাটি তাই শুধু দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও নিয়মিত সংলাপ চালু থাকলে পারস্পরিক উদ্বেগ ও স্বার্থ নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। আর সেই পথেই বাংলাদেশ এগোতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত