সংকটে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৪০ বার
সংকটে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প

প্রকাশ: ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উত্তরের প্রাচীন জনপদ পাবনা জেলাকে সারাবিশ্বের কাছে সগর্বে পরিচিত করে তুলেছে যে ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতটি, তা হলো এখানকার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প। কিন্তু বর্তমানে চরম দুর্দিন ও এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে এই জনপদের সুপ্রাচীন এই শিল্পটি। ভারতের সঙ্গে স্থলপথে পণ্য রপ্তানি প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পাবনা সদর ও এর আশপাশের এলাকার প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানার উৎপাদনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। উৎপাদিত পণ্য সময়মতো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠাতে না পারা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের এই ভয়াবহ স্থবিরতার কারণে এই খাতটির সঙ্গে জড়িত থাকা লক্ষাধিক শ্রমিকের মধ্যে প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ শ্রমিক আজ সম্পূর্ণ কর্মহীন ও বেকার হয়ে পড়েছেন। একসময়ের মুখরিত ও কর্মব্যস্ত কারখানাগুলোর ফ্লোরগুলো আজ খাঁ খাঁ করছে, আর মালিক-শ্রমিক উভয়ের চোখেই এখন কেবল অনিশ্চয়তা ও চরম হতাশার কালো ছায়া ঘনীভূত হয়ে আছে। ব্যাংকের লোন, দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে অনেক স্বনামধন্য উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে তাদের আজীবনের তিলতিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে পথে বসেছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্র সাধুপাড়া মহল্লার পরিচিত হোসিয়ারি ব্যবসায়ী আরিফ হোসেনের জীবনসংগ্রামের গল্পটি যেন এই সমগ্র সংকটেরই এক নিখুঁত ও মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। একসময় ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করে তিনি অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে একটি বিশাল হোসিয়ারি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে প্রায় চার শতাধিক অসহায় ও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল। পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বেশ ভালোই মুনাফা অর্জন করছিলেন তিনি এবং ব্যবসার পরিধিও দিন দিন প্রসারিত হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে ভারতে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আকস্মিক ধাক্কায় তার ব্যবসায়ে ধস নামে। উৎপাদিত লক্ষাধিক টাকার গেঞ্জি ও অন্যান্য পোশাক গুদামজাত অবস্থায় পচে যাওয়ার উপক্রম হয়, অথচ ক্রেতাদের কাছে সেগুলো বিক্রি করার কোনো সুযোগ বা পথ খোলা ছিল না। নতুন করে কোনো মূলধন বা নগদ অর্থ হাতে না থাকায় এবং পাওনাদারদের ক্রমাগত চাপের মুখে একপর্যায়ে তাকে বাধ্য হয়েই তার স্বপ্নের কারখানাটি চিরতরে তালাবদ্ধ করে দিতে হয়। বর্তমানে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে তিনি সম্পূর্ণ দেউলিয়া অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, আর তার কারখানায় কর্মরত সেই চারশ শ্রমিক আজ পেটের দায়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিশেহারা হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

শুধু আরিফ হোসেন একা নন, তার মতো পাবনার হাজার হাজার হোসিয়ারি উদ্যোক্তা আজ ধ্বংসের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছেন। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের কাছ থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উদ্বেগজনক তথ্যে জানা গেছে যে, পাবনা জেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ ও পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় তিন হাজার ছোট-বড় কারখানায় একসময় লক্ষাধিক শ্রমিক অত্যন্ত কর্মব্যস্ত সময় পার করতেন। কিন্তু বর্তমানের এই চরম রপ্তানি সংকটের কারণে সেই কারখানাসমূহের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ শ্রমিকই আজ বেকারত্ব বরণ করতে বাধ্য হয়েছেন। অর্ধেকের বেশি কারখানা ইতোমধ্যে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে এবং যে গুটিকয়েক কারখানা কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তারাও নামমাত্র শ্রমিক নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সম্মানিত সভাপতি সেলিম সরদার অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের মোট হোসিয়ারি পণ্যের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ একসময় এই পাবনা থেকেই উৎপাদিত হয়ে বিদেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন সকাল থেকেই কারখানার মালিকদের সঙ্গে পাওনাদার ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের চরম বিরোধ লেগেই আছে, যা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক বিরাট হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাবনার এই হোসিয়ারিশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর গোড়াপত্তন হয়েছিল প্রায় দুইশ বছর আগে। তৎকালীন সময়ে শহরের বুক চিরে সর্পিল গতিতে বয়ে চলা ঐতিহাসিক ইছামতী নদীপথেই এই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি ও রপ্তানি পরিচালিত হতো। সেই আমলে ব্রিটিশ আমলের ধনাঢ্য হিন্দু ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা দূর-দূরান্ত থেকে উন্নত মানের সুতা আমদানি করে অথবা নিজেদের তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত সুতা দিয়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও টেকসই গেঞ্জি তৈরি করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই মানসম্মত গেঞ্জি শুধু দেশেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে এখানকার অনেক ব্যবসায়ী ভারতে চলে যাওয়ায় এই শিল্পে কিছুটা ভাটা পড়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে তা পুনরায় পুনরুজ্জীবিত হয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে সনাতন সুতার গেঞ্জি তৈরির পরিবর্তে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বড় তৈরি পোশাক কারখানা থেকে কম দামে ঝুট কাপড় বা অপচয় হওয়া কাপড় কিনে এনে নান্দনিক গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক উৎপাদনের এক নতুন বিপ্লব শুরু হয়। এর ফলে এই শিল্পের পরিধি আকাশচুম্বী বিস্তার লাভ করে এবং ভারত, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বাজারে পাবনার ঝুট কাপড়ের তৈরি পোশাকের এক বিশাল ও স্থায়ী চাহিদা তৈরি হয়েছিল।

কারখানার মালিক ও ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই সংকটের মূল সূত্রপাত হয়েছিল মূলত স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই। অতীতে নিয়মিতভাবে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বোঝাই করে হোসিয়ারি পণ্য খুব সহজেই স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে চলে যেত এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত শতাধিক ট্রাক পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশটিতে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই সহজলভ্য স্থলপথ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর হয়ে দীর্ঘ নৌপথে পণ্য পাঠাতে একদিকে যেমন পরিবহন ব্যয় বহুলাংশে বেড়ে গেছে, অন্যদিকে সময় অপচয় হচ্ছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। সবচেয়ে বড় বিপত্তি হলো, নৌপথে পণ্য ভারতে পৌঁছানোর পর সেখানকার ক্রেতাদের কাছ থেকে বিক্রয়লব্ধ অর্থ হাতে পেতে এক মাসেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থের প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো সম্পূর্ণ থামিয়ে দিয়েছে। পর্যাপ্ত মূলধন ও নগদ টাকার অভাবে পাবনার এই সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের শিকার হচ্ছেন এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।

পাবনা শহরতলির দ্বীপচরের উদীয়মান হোসিয়ারি ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলাম অত্যন্ত বেদনাদায়ক সুরে তার বর্তমান অবস্থার কথা প্রকাশ করে জানান যে, তিনি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বড় বড় শিল্পাঞ্চল থেকে ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে এনে নিজের কারখানায় অত্যন্ত আধুনিক মেশিনের সাহায্যে গেঞ্জি, সোয়েটার ও বিভিন্ন ধরনের শীতের পোশাক তৈরি করতেন এবং তা ভারত, মালয়েশিয়া ও কাতারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি করতেন। তাদের উৎপাদিত পোশাকের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মূলত ভারতের বিশাল বাজারে রপ্তানি করা হতো এবং প্রতি সপ্তাহে প্রায় পঁচিশ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি করে তার কারখানায় শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছিল। কিন্তু রপ্তানি কার্যক্রম থমকে যাওয়ার কারণে আজ তার সমস্ত আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণের কিস্তি পরিশোধের চিন্তায় তার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। একই এলাকার সাধুপাড়া মহল্লার এসবি রয়েল গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক মো. আশিক হোসেন জানান যে, স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। পূর্বে কাজের এত বেশি চাপ থাকত যে দম ফেলার বিন্দুমাত্র সময় পাওয়া যেত না এবং শুধুমাত্র পোশাকের কাটিং বা কাটার কাজ করার জন্যই কারখানায় ত্রিশজন দক্ষ কর্মী নিয়োজিত ছিলেন। অথচ বর্তমানে কাজের অভাবে সেই কর্মী সংখ্যা নামতে নামতে মাত্র সাতজনে এসে ঠেকেছে এবং বাকি কর্মীরা কাজ হারিয়ে বেকার বসে আছেন।

সম্প্রতি পাবনার সাধুপাড়া, বাংলাবাজার, দিলালপুর ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে যে, শহরের মূল এলাকাসহ প্রতিটি গ্রামের পাড়া-মহল্লায় গড়ে ওঠা ঝুট কাপড়ভিত্তিক কারখানাগুলোতে এক সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। কোথাও কোথাও নামমাত্র কাপড় কাটা বা সেলাইয়ের কাজ চললেও কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের চোখেমুখে কেবল গভীর উদ্বেগ, আতঙ্ক ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠছিল। প্রতিটি কারখানার গুদাম এবং শো-রুমগুলোতে অবিক্রীত কাপড়ের বস্তা এবং উৎপাদিত পণ্যের স্তূপ জমে রয়েছে, কিন্তু ক্রেতা বা অর্ডারের অভাবে সেগুলোর কোনো বাণিজ্যিক মূল্য আজ আর অবশিষ্ট নেই। সাধুপাড়া ঝুটপল্লির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান যে, তিনি বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে ঝুট কাপড় কিনে এনে স্থানীয় পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। একসময় তার ঝুট কাপড়ের তোলার মতো ফুরসত থাকত না, কিন্তু বিগত দেড় বছর ধরে বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গুদামভর্তি কাঁচামাল নিয়ে তিনি মাসের পর মাস অলস বসে আছেন এবং খরচ চালাতে না পেরে তার ১৫ জন কর্মীর মধ্যে ১০ জনকেই বাধ্য হয়ে ছাঁটাই করতে হয়েছে। একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান যে, তারা প্রত্যেকেই ব্যাংক কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করে এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। দেশের বাজারের তুলনায় বহির্বিশ্বে এবং বিশেষ করে ভারতে তাদের পণ্যের কদর ও ব্যবসা অনেক ভালো ছিল, কিন্তু ভূরাজনৈতিক বা নীতিগত কারণে হঠাৎ করে স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ তাদের মতো হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।

এই দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক সংকটের সরাসরি শিকার হয়ে পাবনার হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষ আজ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিনের পরিচিত কাজ হারিয়ে আফজাল হোসেন নামের এক সাধারণ শ্রমিক জানান যে, তিনি সাধুপাড়া মহল্লার একটি প্রতিষ্ঠিত হোসিয়ারি কারখানায় অত্যন্ত নিয়মিত কাজ করতেন, কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি আজ বেকার হয়ে পড়েছেন এবং পেটের টানে হাড়ভাঙা খাটুনি খোঁজার জন্য অন্য পেশার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। জনি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান জানান যে, অতীতে স্থলপথে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পণ্য ভারতে পৌঁছে যেত এবং সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মাথায় তারা নগদ টাকা হাতে পেয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানের এই জটিল নৌপথে পণ্য পাঠাতে দীর্ঘ কুড়ি থেকে পঁচিশ দিন সময় অপচয় হচ্ছে এবং বিক্রির টাকা হাতে আসতে দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে মূলধন শূন্য হয়ে পড়ায় তারা এখন আগের তুলনায় খুব সামান্য পরিমাণ পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় তাদের কয়েকটি কারখানায় প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক নিরলসভাবে কাজ করতেন, যা বর্তমান সংকটের কারণে কমতে কমতে মাত্র দুই শ জনে এসে ঠেকেছে। জেলার সবচেয়ে বড় হোসিয়ারি পণ্য বিক্রয় কেন্দ্র এ আর কর্নারে উৎপাদিত কাপড়ে নান্দনিক নকশার কাজ করা তরুণ কারিগর তরুণ দাস জানান যে, রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তাদের হাতে কাজ বলতে আর কিছুই নেই। ঘরে বৃদ্ধা অসুস্থ স্ত্রী রয়েছেন, অথচ অর্থাভাবের কারণে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা বা ওষুধ কেনার সামর্থ্য তার নেই। দুই অবুঝ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে কীভাবে দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করবেন, তা তিনি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সম্মানিত পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান এই সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, হোসিয়ারিশিল্প কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক খাত নয়, এটি সরাসরি পাবনা জেলার ঐতিহাসিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এই সম্ভাবনাময় শিল্পটির ওপর ভিত্তি করে একসময় সমগ্র উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের এই চরম ও পুঞ্জীভূত সংকট থেকে এই শিল্পকে যদি অবিলম্বে রক্ষা করা না যায়, তবে পাবনার অর্থনীতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সদিচ্ছা এবং আন্তরিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। অবিলম্বে ভারত সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির ঐতিহ্যবাহী স্থলপথগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের জোর দাবি জানান তিনি। দেশের বর্তমান সরকার দেশের এই ঐতিহ্যবাহী ও শ্রমঘন শিল্পখাতটির সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং পাবনার লক্ষাধিক অবহেলিত শ্রমিক ও উদ্যোক্তার মুখে হাসি ফোটাবে—এমনটাই এখন এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের একমাত্র ঐকান্তিক প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত