প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণের প্রভাবে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে। বুধবার (২২ জুলাই) সকালে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সব মিলিয়ে ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ শুরু হওয়ায় নতুন করে বন্যার শঙ্কায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের হাজারো মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি নেমে আসছে। সেই পানির চাপেই তিস্তার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুধবার সকাল ৬টার পরিমাপে ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র এক সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছিল। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়ে অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ব্যারাজের নিচের অংশে প্রবাহও বেড়েছে এবং তিস্তা তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
ইতোমধ্যে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চল, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়ন, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়ন এবং সদর উপজেলার রাজপুর, খুনিয়াগাছ ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। অনেক এলাকার গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি এবং বসতবাড়ির আঙিনায় পানি জমে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে নদীর পানি ওঠানামা করলেও বুধবার ভোর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছে। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে বন্যার আশঙ্কা আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের বাসিন্দা সোফিয়ার রহমান বলেন, নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, ফসলি জমি এবং গ্রামের সড়কে পানি উঠতে শুরু করেছে। পরিবারগুলো এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তায় রয়েছে গবাদিপশু এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে। পানি আরও বাড়লে স্বল্প সময়ের মধ্যেই অনেক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ডালিয়া পয়েন্টে পানির লেভেল পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, সকাল ৬টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাট ও কৃষিজমিতে পানি প্রবেশ করেছে। উজান থেকে পানির প্রবাহ একইভাবে অব্যাহত থাকলে জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে নদীর পানির চাপ বাড়ার কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক বাঁধের প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। ফলে অতিরিক্ত পানির চাপে এসব বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুম এলেই জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শুষ্ক মৌসুমে টেকসই সংস্কার করা হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা।
গোবর্ধন গ্রামের বাসিন্দা বশির উদ্দিন বলেন, পানির বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করছেন তারা। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া বাঁধ ভেঙে গেলে নদীপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। প্রতি বর্ষাতেই এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয় বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নদীপাড়ের আরেক বাসিন্দা আব্দুল জব্বার বলেন, কয়েক দিন ধরে পানি বাড়া-কমার মধ্যে থাকলেও বুধবার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে এবং অনেক পরিবার পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজান থেকে পানির প্রবাহ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নদীতীরবর্তী এবং চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার রায় বলেন, বুধবার ভোর থেকে তিস্তা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনো পানি বিপৎসীমার সামান্য নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিনি জানান, উজানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং পানির প্রবাহের ওপর পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
আবহাওয়া ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে ভারতের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় কৃষকদের দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ হলো কৃষিজমিতে পানি প্রবেশ। অনেক জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে এসব ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাজারব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা অববাহিকায় দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও উজানের ঢলের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতীরবর্তী মানুষের ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই এই অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এদিকে প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। পানি আরও বৃদ্ধি পেলে প্রয়োজনীয় ত্রাণ, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে সম্ভাব্য বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত