প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) হলের খাবারের মান নিয়ে মন্তব্য করাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জরুরি সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীকে চার সেমিস্টারের জন্য একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী দুই বছর তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া তাদের আবাসিক হলের আসনও স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই জরুরি ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সভা ডেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক অফিস বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পর্যালোচনা করে চার সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার এবং দুই বছরের জন্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বরাদ্দকৃত আসন আজীবনের জন্য বাতিল করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থী হলেন পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের সদ্য বহিষ্কৃত যোগাযোগ সম্পাদক হাসিবুর রহমান এবং পরিসংখ্যান বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও সদ্য বহিষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক তারেক রহমান।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে খাবারের মান নিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই মন্তব্যের জেরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। বিষয়টি দ্রুত ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে টানা কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। তারা দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সভায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সিন্ডিকেটের এক সদস্য জানিয়েছেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নয়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে তিনি যাতে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করছেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মত প্রকাশ বা অভিযোগ জানানোর কারণে কোনো শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তা, যুক্তি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা। সেখানে সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের কোনো স্থান নেই। প্রশাসনের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে একটি শক্ত বার্তা দেবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীদের একটি অংশও প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে প্রশাসনের আন্তরিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে তারা একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করে যদি অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহিংসতার যেকোনো ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নয়, পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। তাই প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে ভবিষ্যতেও যেকোনো ধরনের সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বা সমস্যার সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপার্থক্য বা অভিযোগের সমাধান হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে নয়। সাম্প্রতিক এই ঘটনার পর প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ এবং শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ দ্রুত ফিরে আসবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত