ফরাসি জাতীয় দলের নতুন কোচ হিসেবে জিদানের অভিষেক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৩ বার
ফরাসি জাতীয় দলের নতুন কোচ হিসেবে জিদানের অভিষেক

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা এবং নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফরাসি ফুটবলের আকাশে এক নতুন ও স্বর্ণালী সূর্যের উদয় হয়েছে। ফরাসিদের বর্ণিল ডাগআউটে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মহানায়ক জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে এক সম্পূর্ণ নতুন ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। দীর্ঘ এক যুগ ধরে সফলতার সঙ্গে ফরাসি জাতীয় দলকে কোচিংসহ বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পর প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ান দিদিয়ে দেশম। তার উত্তরসূরি হিসেবে ফরাসি ফুটবলের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি তারকা জিনেদিন জিদানকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে ঘোষণা করেছে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন বা এফএফএফ। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার আয়োজিত এক জমকালো প্রেস ব্রিফিংয়ে এই যুগান্তকারী ও প্রতীক্ষিত ঘোষণাটি প্রদান করেছেন এফএফএফ সভাপতি ফিলিপ দিয়ালো। দীর্ঘ সময় ধরে ফরাসিদের এই মর্যাদাপূর্ণ হটসিটে বসার আলোচনায় সবার ওপরে নাম ছিল জিজুর এবং তিনিও নিজের দেশের জাতীয় দলকে কোচিং করানোর এই স্বপ্নের পদের জন্য বছরের পর বছর ধরে মুখিয়ে ছিলেন।

খেলোয়াড়ি জীবনের পর থেকেই কোচ হিসেবে বিশ্ব ফুটবলে নিজের জাত চিনিয়েছেন ৫৪ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ড জিনেদিন জিদান। ২০২১ সালে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের সফল ডাগআউট ছাড়ার পর থেকে আর অন্য কোনো ক্লাবের ম্যানেজারের দায়িত্ব নেননি তিনি, মূলত নিজের জাতীয় দলের ডাক পাওয়ার জন্যই তিনি নিজেকে অপেক্ষায় রেখেছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বমানের ক্লাবকে কোচ হিসেবে টানা তিনটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি উপহার দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য ও অনন্য কীর্তি রয়েছে তার গৌরবময় ঝুলিতে, যা আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আর কোনো একক কোচের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তার ট্যাকটিক্যাল জ্ঞান, ডাগআউটে শান্ত অথচ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং খেলোয়াড়দের সেরা পারফরম্যান্স বের করে আনার জাদুকরি ক্ষমতার কারণে তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা কৌশলবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফরাসি জাতীয় দলের প্রধান কোচের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমে তিনি এখন তার বর্ণাঢ্য কোচিং ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়ে পা রাখলেন।

বিদায়ী কোচ দিদিয়ে দেশম ২০১২ সাল থেকে শুরু করে টানা এক যুগেরও বেশি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ফ্রান্স জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শক্তিশালী স্পেনের কাছে হেরে ফ্রান্স বিদায় নেওয়ার পর দেশম তার বর্ণাঢ্য কোচিং অধ্যায়ের ইতি টানেন এবং জাতীয় দলের ডাগআউট থেকে চিরতরে বিদায় নেন। দেশমের দীর্ঘ ও সফল কোচিং শাসনামলেই ফরাসিরা ২০১৮ সালে বিশ্বজয়ের সোনালী স্বাদ পেয়েছিল, যা পুরো জাতির জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক অর্জন। এছাড়া তার অধীনেই ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল ফরাসিরা, যেখানে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের। এর আগে ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ইউরো কাপের ফাইনালেও পর্তুগালের বিপক্ষে তার দল হৃদয়ভাঙা হারের মুখোমুখি হয়েছিল। দেশমের রেখে যাওয়া এই সমৃদ্ধ ও উঁচুমার্গের উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখা এবং তা আরও সমৃদ্ধ করার বড় দায়িত্ব এখন জিনেদিন জিদানের কাঁধে বর্তেছে।

ফরাসি জাতীয় দলের প্রধান কোচের গুরুদায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে জিনেদিন জিদান তার আরও এক ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থের ঐতিহ্যবাহী পথ অনুসরণ করলেন। এর আগেও ফরাসি ফুটবলের সোনালী প্রজন্মের তারকারা জাতীয় দলের ডাগআউটে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ সালে একসঙ্গে ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার গৌরব অর্জন করা লরেন ব্লাঙ্ক ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এবং পরবর্তীতে দিদিয়ে দেশম দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রান্সের কোচের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে সামলেছিলেন। সেই একই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার জিদানের হাতে ফরাসি ফুটবলের অভিভাবকত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। খেলোয়াড় হিসেবে ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে জিদানের অবদান চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ ফাইনালে শক্তিশালী ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-০ গোলের অবিস্মরণীয় জয়ে জিজুর করা দুটি চোখ জুড়ানো হেডার গোল আজও বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অত্যন্ত সজীব ও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

এর ঠিক দুই বছর পর ২০০০ সালে ফ্রান্সকে একক নৈপুণ্যে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরো কাপ জেতানোর পেছনেও তার ছিল অত্যন্ত মূখ্য ও অসামান্য ভূমিকা, যার স্বীকৃতিস্বরূপ সেই বছরই তিনি মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর পুরস্কার জয় করেছিলেন। ফ্রান্সের জার্সিতে মোট ১০৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৩১টি গোল করা এই বিশ্বমানের প্লেমেকার ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে তার সেই বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক প্যানেনকা স্পট কিক গোল এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সময়ে ঘটে যাওয়া মার্কো মাতেরাজ্জিকে বুক দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার সেই লাল কার্ড দেখার ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক আলোচিত ও নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে ঝড় তোলা এই কিংবদন্তি যখন এবার স্যুট পরে টেকনিক্যাল এরিয়ায় দাঁড়িয়ে ফরাসিদের নির্দেশ দেবেন, তখন তা পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর দৃশ্য হয়ে উঠবে।

নতুন কোচ হিসেবে জিনেদিন জিদান যুগের অধীনে ফ্রান্স জাতীয় দলের অত্যন্ত অগ্নিপরীক্ষায় ভরা প্রথম মিশন শুরু হতে যাচ্ছে চলতি বছরের অত্যন্ত সন্নিকটে থাকা সেপ্টেম্বর মাসে। উয়েফা নেশনস লিগের অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর তুরস্কের বিরুদ্ধে তাদেরই ঘরের মাঠে আতিথ্য নেবে জিদানের নতুন শিষ্যরা। এরপর মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর তাদের লড়তে হবে শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে এক কঠিন অ্যাওয়ে ম্যাচে। ইউরোপের এই দুই হাইভোল্টেজ ম্যাচের রেশ কাটতে না কাটতেই আগামী ২ অক্টোবর ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক মাঠ স্টাদে দে ফ্রান্সে ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বী ইতালিকে আতিথ্য দেবে জিদানের শিষ্যরা। ঘরের মাঠে ইতালির মতো পরাশক্তি দলের বিপক্ষে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি দিয়েই ফরাসি ডাগআউটে জিদানের হোম ম্যাচ অভিষেক সম্পন্ন হবে। বিশ্ব ফুটবলের এই নতুন সেনাপতির হাত ধরে ফরাসি ফুটবল দল তাদের পুরোনো গৌরবকে ছাড়িয়ে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে এবং নতুন প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে তিনি কীভাবে ফরাসিদের বিশ্বমঞ্চের অবিসংবাদিত সম্রাট হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী ও ক্রীড়া বিশ্লেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত