প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালনে ৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে টানাপোড়েনের মধ্যেই জ্বালানি বাজারে এই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। জ্বালানি মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় ডিজেল মূল্য প্রথমবারের মতো ৬ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতের জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশটির পণ্য পরিবহনব্যবস্থা, কৃষি, নির্মাণ, শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনায় ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে খাদ্য, পোশাক, শিল্পপণ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামেও পড়তে পারে।
গ্যাসবাডির হিসাবে, গত এক বছরের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় ২ ডলার ৩০ সেন্ট বেড়েছে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানি ব্যয়ের যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তা—উভয়ের ওপরই ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ডিজেলের এই ঊর্ধ্বগতি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ডিজেলের দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এর পাশাপাশি রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলাও ডিজেল সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করেছে। হামলার কারণে কয়েকটি শোধনাগারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং চীনের জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত করেছে। ফলে একদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
এই পরিস্থিতির প্রভাব অপরিশোধিত তেলের বাজারেও স্পষ্ট। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৬৩ ডলারে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১০২ দশমিক ৪৮ ডলারে পৌঁছায়। দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। ১০০ ডলারের ওপরে তেলের দাম ফিরে আসায় বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মজুদের অবস্থাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের মজুত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম। বর্তমানে মজুতের পরিমাণ প্রায় ১০৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল। চাহিদা মেটাতে শোধনাগারগুলো উচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন চালালেও মজুত পর্যাপ্ত পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি বাজারের এই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজেলের চাহিদা সহজে কমানো যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে রেলপথ, নৌযান, কৃষিযন্ত্র এবং নির্মাণকাজের ভারী সরঞ্জাম—বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ডিজেল ব্যবহার তাৎক্ষণিকভাবে কমাতে পারে না। এই কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে কৃষিখাতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষকদের ট্রাক্টর, হারভেস্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিচালনায় ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে জমি প্রস্তুত করা, বপন, ফসল সংগ্রহ এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবহন খাতেও পরিস্থিতি চাপ তৈরি করছে। একটি পণ্য কারখানা থেকে গুদাম, গুদাম থেকে পরিবহনকেন্দ্র এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধাপে জ্বালানি ব্যয় হয়। ডিজেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে প্রতিটি ধাপেই পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে ভোক্তারা শুরুতে জ্বালানির পাম্পমূল্যের পরিবর্তন সরাসরি অনুভব না করলেও কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে নিত্যপণ্যের দামে এর প্রভাব দেখতে পারেন।
গ্যাসবাডির বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হানের মতে, রেকর্ড ডিজেলের দাম যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করবে। ট্রাক পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, পার্সেল ডেলিভারি থেকে শুরু করে মুদি কেনাকাটা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
এদিকে শোধনাগারগুলো উচ্চ উৎপাদনক্ষমতায় কাজ করলেও বাজারের সংকট পুরোপুরি কাটছে না। আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সামনে বিভিন্ন শোধনাগারে মৌসুমি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হলে ডিজেলের মজুত আরও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন। এতে বছরের শেষভাগ পর্যন্ত ডিজেলের বাজার অস্থির থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
ডিজেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি করেছে। আগামী নভেম্বরে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দাম ও জ্বালানি ব্যয় যদি আরও বাড়তে থাকে, তাহলে সেটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। কারণ জ্বালানির দাম সরাসরি পরিবহন ও পরোক্ষভাবে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্যকে প্রভাবিত করে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যয় কমানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সংঘাত ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে শুধু অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদে বাজারের চাপ পুরোপুরি কমানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকা, ডিজেলের বৈশ্বিক মজুত সংকুচিত হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি—সবকিছু মিলিয়ে জ্বালানি বাজার এখন এক অনিশ্চিত সময় পার করছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালনে ৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করা সেই সংকটেরই একটি দৃশ্যমান প্রতীক। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মার্কিন পরিবহন বা কৃষি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতিতেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের এই রেকর্ড মূল্যকে কেবল একটি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকেরা। এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানির পরবর্তী গতিপথ।