ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ ও তীব্র সংকট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ ও তীব্র সংকট

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আর্থিক খাতের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেল দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক মন্দা, রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং তীব্র অভ্যন্তরীণ ও ব্যবস্থাপনা সংকটের গোলকধাঁধায় পড়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদিল চৌধুরী। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন। এরপর থেকেই তিনি ব্যাংক কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি থেকে বিরত রয়েছেন বলে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। একজন শীর্ষ নির্বাহীর এমন আকস্মিক ও নাটকীয় প্রস্থান কেবল ন্যাশনাল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকেই স্পষ্ট করে তুলছে না, বরং দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভঙ্গুর দশার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলছে সাধারণ আমানতকারী ও সচেতন মহলের সামনে।

গত বছরের ৭ জুলাই সম্পূর্ণ নতুন আশার বাণী শুনিয়ে তিন বছরের চুক্তিতে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আদিল চৌধুরী। এর আগে তিনি দেশের আরেকটি পরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের পুঞ্জীভূত সংকট উত্তরণের এক সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখেছিল সংশ্লিষ্ট মহল। কিন্তু নানা জটিলতা, প্রতিকূল কর্পোরেট পরিবেশ এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের কারণে নিজের নির্ধারিত তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ করার অনেক আগেই তিনি শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। এর মধ্য দিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে আবারও এক অনিশ্চিত শূন্যতা ও নেতৃত্বের সংকট তৈরি হলো, যা প্রতিষ্ঠানটিকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

ন্যাশনাল ব্যাংকের শীর্ষ পদে মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করার এই ঘটনা ব্যাংকটির জন্য নতুন কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। এর আগেও ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান তার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। একের পর এক শীর্ষ নির্বাহীর এমন আকস্মিক প্রস্থান প্রমাণ করে যে, ন্যাশনাল ব্যাংকের ভেতরের বর্তমান কর্মপরিবেশ কতটা প্রতিকূল এবং দায়িত্ব পালন করা কতটা দুরূহ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর ও সর্বগ্রাসী আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলছে। উচ্চ হারে খেলাপি ঋণের পাহাড়সমান বোঝা, বছরের পর বছর ধরে চলা ধারাবাহিক লোকসান এবং আতঙ্কিত আমানতকারীদের পক্ষ থেকে লাগাতার আমানত প্রত্যাহারের তীব্র চাপ ব্যাংকটির সার্বিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে এমন এক অসহনীয় ও কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে যেখান থেকে উত্তরণ সহজ নয়। ২০২২ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটি টানা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, ব্যাংকটির পুঞ্জীভূত লোকসানের মোট পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় আট হাজার নয়শ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিশাল অঙ্কের এই পুঞ্জীভূত লোকসান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং সুশাসনের অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ ঋণ বিতরণের এক ভয়ানক পরিণতি। ঠিক এমন একটি অসহনীয় ও নাজুক মুহূর্তে আদিল চৌধুরীর পদত্যাগ ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইকে আরও বেশি হোঁচট খাইয়ে দিল। সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা যখন তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তখন শীর্ষ নির্বাহীর এই প্রস্থান আস্থার সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অবশ্য এই তীব্র আর্থিক সংকট ও অচলাবস্থা থেকে ব্যাংকটিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার এবং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সম্প্রতি কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংকট উত্তরণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা পান্থপথে নির্মাণাধীন বহুতল ‘টুইন টাওয়ার’ ভবনটি নিয়মমাফিক ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেছে। সংশ্লিষ্ট বাজার বিশ্লেষক ও আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, এই সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন ঘটানো গেলে তার মাধ্যমে ব্যাংকটির আয় বাড়ানোর নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশাল এই বাণিজ্যিক সম্পদ থেকে আসা নিয়মিত ভাড়া বা ইজারালব্ধ অর্থ ব্যাংকটির দৈনন্দিন নগদ প্রবাহের সংকট কিছুটা হলেও শিথিল করতে এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে কেবল একটি ভবন ইজারা দিয়ে এই বিশাল অঙ্কের পুঞ্জীভূত লোকসান ও পাহাড়সমান খেলাপি ঋণ কাটিয়ে ওঠা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকেই যায়।

এদিকে কেবল আর্থিক সংকটই নয়, ন্যাশনাল ব্যাংকের মালিকানা কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা পর্ষদের নীতিনির্ধারণী বিষয়েও গত কয়েক বছরে বেশ কিছু নাটকীয় ও বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনকালে দেশের প্রভাবশালী সিকদার গ্রুপ দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও সার্বিক কার্যক্রম নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকটি থেকে যেভাবে লাগামহীন ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, আজকের এই ভয়াবহ পতনের বীজ মূলত তখনই রোপিত হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর ও সরাসরি হস্তক্ষেপে সিকদার গ্রুপ অবশেষে ব্যাংকটির ওপর থেকে তাদের দীর্ঘ একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ও পুনর্গঠিত পর্ষদের মাধ্যমে ব্যাংকটিতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার জোরালো চেষ্টা চালানো হলেও দীর্ঘদিনের জমে থাকা জঞ্জাল এক নিমেষে দূর করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং খাত, আর সেই খাতের অন্যতম স্তম্ভ যখন একের পর এক অব্যবস্থাপনা ও শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের পদত্যাগের মুখে পড়ে তখন তা গোটা অর্থনীতির জন্যই এক বিরাট অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। ন্যাশনাল ব্যাংকের এই করুণ দশা কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের ব্যর্থতা নয়, বরং এটি সমগ্র আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসনের অনুপস্থিতির এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রেখে এখন প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কখন কার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় কিংবা কার জমানো টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, সেই শঙ্কা এখন প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের মনে বাসা বেঁধেছে। ব্যাংকটির এই শোচনীয় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে হলে কেবল রুটিন মাফিক পদত্যাগ বা খণ্ডকালীন ইজারার সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়; বরং এর পেছনে জড়িত দুর্নীতিবাজ ও খেলাপি ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও বেশি বলিষ্ঠ ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই গভীর ও অতল খাদের কিনারা থেকে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানো এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়তেই পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত