প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রবাসীর দেশ বা বিদেশ ভ্রমণের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো পাসপোর্ট। আর এই অতি জরুরি ও অপরিহার্য নথিটি হাতে পেতে সাধারণ মানুষকে কতখানি দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়, তার এক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রমে। সরকারের পক্ষ থেকে সেবা সহজীকরণ এবং জনগণের দোরগোড়ায় নাগরিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার নানা রকম প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সামান্য কিছু অজুহাত বা কাগজের ছোট্ট ত্রুটিকে পুঁজি করে সেবাগ্রহীতাদের মাসের পর মাস ঘোরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কাগজপত্রে সামান্য অমিল থাকলেই তা সংশোধন করে দেওয়ার পরিবর্তে ফাইল বারবার ফেরত পাঠানো হয়, আর সেই একই ফাইল যখন অতিরিক্ত আর্থিক লেনদেন বা উৎকোচের বিনিময়ে পুনরায় জমা দেওয়া হয়, তখন নিমেষেই সব ত্রুটি দূর হয়ে যায়। দিনের পর দিন এমন হয়রানির শিকার হয়ে সাধারণ মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন, যা দেশের প্রশাসনিক সেবা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
সম্প্রতি রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এবং বিভিন্ন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভবেশ চন্দ্র রায় নামের এক ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্রে নাম সঠিকভাবে থাকলেও কেবল বিদ্যুৎ বিলের কপিতে নামের সামান্য পার্থক্যের কারণে অন্তত চার দিন এই দপ্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বৈধ ও সঠিক থাকা সত্ত্বেও অকারণে বারবার তার ফাইল ফেরত দেওয়া হয় এবং কোনো না কোনো অজুহাত দাঁড় করানো হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে গত ২৬ জুলাই তিনি বাধ্য হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালকের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন এবং তার হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। শুধু ভবেশ চন্দ্র একা নন, রংপুর নগরীর খটখটিয়া এলাকা থেকে আসা নিশি রানী রায় নামের এক নারী তার শিশুসন্তানকে নিয়ে পাসপোর্ট করাতে এসে চরম বিপাকে পড়েন। তার সরল স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ভুলবশত সন্তানের পেশার জায়গায় লেখা হয়েছিল পেশা নেই, যার কারণে সংশ্লিষ্টরা বারবার তার আবেদনপত্রটি বাতিল করে ফিরিয়ে দেন। একজন কোমলমতি শিশুর পেশা ঠিক কী হতে পারে, তা তিনি বুঝতে না পেরে যখন উপপরিচালকের দপ্তরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন বাইরে দায়িত্বরত লোকজন ও রক্ষীরা তাকে দেখা করতে না দিয়ে উল্টো খারাপ ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন। চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার তাড়া থাকলেও এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে তিনি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে জানা যায়, রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে ও বাইরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্র। এই চক্রের সঙ্গে অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং কতিপয় আনসার সদস্য সরাসরি জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অফিসের উত্তরের দরজা দিয়ে প্রবেশ করার সময় সাধারণ মানুষকে নানা রকম দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ যারা বাইরে থাকা নির্দিষ্ট কিছু কম্পিউটারের দোকানদারের সঙ্গে কিংবা অফিসের ভেতরের মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে আগে থেকেই আর্থিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেন, তাদের কোনো কাগজপত্রের বাছবিচার ছাড়াই খুব সহজে কাজ হয়ে যায়। তাদের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটিই চোখে পড়ে না এবং তারা কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই সরাসরি দোতলায় গিয়ে ছবি তুলে নিরাপদে কাজ সেরে ফেলতে পারেন। সাধারণ নিয়মে যেখানে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে এবং নানা ত্রুটির অজুহাতে ফাইল নিয়ে ফেরত যেতে হয়, সেখানে উৎকোচ বা ঘুষের বিনিময়ে সেই একই ফাইল মুহূর্তের মধ্যে বৈধ রূপ লাভ করে। এই দ্বিমুখী নীতি এবং বৈষম্যমূলক আচরণ সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, যদিও এটি একটি আঞ্চলিক কার্যালয়, তবুও পূর্বে রংপুরের বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আবেদনকারীদের ফাইল নানা বাহানায় ফেরত পাঠানো হতো। এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হতেন এবং প্রতিদিন মাত্র পঞ্চাশ থেকে ষাটটি আবেদন জমা পড়ার কারণে দপ্তরে কাজের পরিধিও বেশ সীমিত ছিল। তবে বর্তমান উপপরিচালক যোগদানের পর সেই পুরনো ও হয়রানিমূলক নিয়ম বাতিল করার নির্দেশ প্রদান করেন, যার ফলে এখন বাইরের জেলার নাগরিকরাও এই অফিস থেকে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারের এই জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে একটি অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে। বর্তমানে নিয়মানুযায়ী ৪৮ পৃষ্ঠার পাঁচ বছর মেয়াদি নিয়মিত ই-পাসপোর্টের জন্য সরকারি ফি চার হাজার পঁচিশ টাকা এবং জরুরি ও অতি জরুরি সেবার জন্য যথাক্রমে ছয় হাজার তিনশত পঁচিশ এবং আট হাজার ছয়শত পঁচিশ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া দশ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের নিয়মিত ফি পাঁচ হাজার সাতশত পঞ্চাশ টাকা ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি এই নির্ধারিত ফির বাইরে অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ, ছবি তোলা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত ও ফাইল প্রসেসিংয়ের নামে বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরেও বিভিন্ন অজুহাতে অবৈধভাবে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি এই অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসেছে।
অফিসের ভেতর ও বাইরে সংঘটিত এই অনিয়মের শিকার হয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাধারণ মানুষ তাদের দুঃখের কথা ব্যক্ত করেছেন। রংপুরের মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ি এলাকা থেকে আসা একজন সরকারি চাকরিজীবী রুহুল আমীন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে তিনি এর আগেও একাধিকবার পাসপোর্ট করেছেন, হজ পালন করেছেন, তখন কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি। অথচ বর্তমান সময়ে এসে তার নাম কেন মোহাম্মদ যুক্ত নেই, সেই অবান্তর কারণ দেখিয়ে তার পাসপোর্ট ইস্যু করা আটকে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরেও তিনি এর কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না। তার পাশেই দাঁড়ানো আরেক সেবাপ্রত্যাশী আব্দুল মোতালেব জানান যে ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স না থাকার অজুহাতে চার দিন ধরে তাকে ঘুরানো হচ্ছে। মাসুদ রানা নামের আরেক ভুক্তভোগী সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করে বলেন যে, শুধুমাত্র একটি শব্দের সামান্য ভুল দেখিয়ে তার আবেদনপত্র একাধিকবার ফেরত দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে অফিসের আনসার সদস্য খোকনকে এক হাজার দুইশত টাকা উৎকোচ দেওয়ার পরই কেবল তার সেই একই আবেদনপত্র জমা নেওয়া হয়েছে। পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়ন থেকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট করতে আসা বয়োবৃদ্ধ আব্দুস সাত্তারও একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু সনদ এবং বর্তমান স্ত্রীর আগের স্বামীর মৃত্যু সনদ না থাকার অজুহাতে তার আবেদন আটকে দেওয়া হয়। এরপর আনসার সদস্যদের কেউ দুই হাজার দুইশত এবং কেউ আড়াই হাজার টাকা দাবি করেন এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দুই হাজার দুইশত টাকা দেওয়ার পরেই তার আবেদন জমা নেওয়া সম্ভব হয়।
সেবাপ্রত্যাশীদের এই সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আনসার সদস্যরা নিজেদের পুরোপুরি দায়মুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন যে তারা কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নন। উল্টো তারা সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করে থাকেন বলে দাবি করেন। একইভাবে অফিসের বাইরে অবস্থানরত কম্পিউটারের দোকানদাররা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে জানান যে আবেদনকারীরা কেবল তাদের কাগজপত্রের ফরম পূরণ ও তথ্য সংশোধনের জন্যই তাদের কাছে আসেন এবং এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো দুর্নীতির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও ভুক্তভোগীদের প্রত্যক্ষ বয়ানে এই অস্বীকার করার প্রবণতা যে কেবল দায় এড়ানোর একটি কৌশল মাত্র, তা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়। সাধারণ মানুষ যখন প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, তখন এই ধরনের দায়সারা জবাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সারóিক এই পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রংপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক জামাল হোসেন স্বীকার করেছেন যে তিনি এই অফিসে নতুন যোগদান করেছেন এবং যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও সমস্যার বিষয়গুলো তার নজরে এসেছে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে যারা এই ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ইতিমধ্যে অফিসের বাইরে থেকে আসা দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের হয়রানি কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হয়রানি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ এখন কেবল মুখের আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত এই দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্তি চান এবং পাসপোর্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজ ও হয়রানিমুক্ত দেখতে চান।