প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি পদক্ষেপে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সমাজের অবহেলিত, পিছিয়ে পড়া এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে একের পর এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজের কার্যদিবসের শুরুতেই এক আবেগঘন ও অনুপ্রেরণাদায়ক পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তিন কৃতি ব্যক্তির হাতে সরাসরি সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মসংস্থানের এই মহতী উদ্যোগ কেবল এই তিন ব্যক্তির জীবনকেই বদলে দেয়নি, বরং পুরো সমাজের কাছে এটি এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মেধার পথে বাধা হতে পারে না।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করার প্রাক্কালে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেসসচিব জুলফিকার হাসান শিপলু সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কেবল অনুদান বা ত্রাণের ওপর নির্ভর করে না রেখে, বরং তাদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার যে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সরকার নিয়েছে, এই নিয়োগ প্রদান তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। সমাজের মূলধারায় তাদের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রীর এই স্রেফ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি এক গভীর মানবিক উপলব্ধির প্রকাশ হিসেবে দেশের মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
এদিন যাদের হাতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সরাসরি নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে চরম প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজ সাফল্যের এই উচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। নিয়োগপ্রাপ্ত এই তিনজন সৌভাগ্যবান হলেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মেধাবী মুখ আয়শা আক্তার, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক নীলা খাতুন এবং নড়াইল সদর উপজেলার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ মো. হাসমত আলী। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরাসরি নিজেদের কাঙ্ক্ষিত চাকরির নিয়োগপত্র গ্রহণ করার পর তাদের চোখ-মুখে যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের ঝিলিক দেখা গেছে, তা উপস্থিত সকলকেই আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। তাদের কাছে দিনটি কেবল একটি নতুন কর্মজীবনের সূচনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও সাধনার এক পরম প্রাপ্তি এবং নতুন এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
এই তিন অসাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প যে কাউকে অনুপ্রেরণা জোগাতে বাধ্য। নিয়োগপ্রাপ্ত নীলা খাতুন ও আয়শা আক্তার দুজনই জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার এবং তাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর আচরণ বা শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্নকে একবিন্দুও দমাতে পারেনি। অদম্য মনোবল ও জেদের জোরে তারা নিজেদের পা দিয়ে লিখে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছেন এবং অবশেষে সম্মানজনক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জন্মদত্ত দুই হাত না থাকার প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা নীলা খাতুনকে রাজধানীর মিরপুরের স্বনামধন্য জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকতার মতো একটি মহান পেশায় তার এই যোগদান সমাজে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
অন্যদিকে, একইভাবে পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী অপর সংগ্রামী নারী আয়শা আক্তারও তার মেধার যোগ্য সম্মান পেয়েছেন। হাত না থাকার কারণে তিনি মুখ দিয়ে পরম যত্ন ও আনন্দের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিজের নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন। তাকে গাইবান্ধার ঐতিহ্যবাহী বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস সুপারভাইজার পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে তার এই মেধা ও অভিজ্ঞতা ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া এই তালিকায় থাকা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ মো. হাসমত আলী তার অদম্য মেধার বলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে নিয়োগ লাভ করেছেন। সমাজের প্রান্তিক মানুষের সেবা করার এই সুযোগ তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
এই পুরো আয়োজনের সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি উপস্থিত থেকে এই মহতী উদ্যোগের সাক্ষী হয়েছেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। সরকারের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই তিন মেধাবী সন্তানকে সরাসরি সরকারি চাকরি প্রদান করায় সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনেরাও। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের পরিচিত মুখ আবদুস সাত্তার দুলাল প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক পদক্ষেপকে অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন। নিয়োগপত্র হস্তান্তরের পরপরই তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং এই ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। সচেতন মহল মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ধরনের উদ্যোগ দেশের লাখ লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে এবং তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।