খাল খননের ১.৪৮ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
খাল খননের ১.৪৮ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত

প্রকাশ:  ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি অর্থ ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সুশাসনের এক উজ্জ্বল ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম আহমেদ। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ নয়ছয় বা অপচয়ের সংস্কৃতি যখন প্রায়শই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, ঠিক সেই সময়ে সম্পূর্ণ সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার পরও বেঁচে যাওয়া প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে দেশজুড়ে প্রশংসার সৃষ্টি করেছেন এই সৎ কর্মকর্তা। সাধারণ মানুষের করের টাকার সঠিক মূল্যায়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির এক অনন্য বাস্তবায়ন হিসেবে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মাঝে এই ঘটনাটি দারুণ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, যা দেশের অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্যও একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার অবহেলিত ও পানিবাহিত জনপদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য ঝিকরা এবং শুভডাঙ্গা ইউনিয়ন এলাকায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই দুটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মোট তিন কোটি ষাট লাখ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছিল। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বরাদ্দের টাকায় ওই দুই ইউনিয়নে মোট চৌদ্দ কিলোমিটার খাল খনন করার কথা ছিল। স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম করার লক্ষ্যেই এই খনন কাজ শুরু করা হয়েছিল। অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে কাজটি পরিচালনা করায় নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম খরচে কাজের একটি বড় অংশ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের হিসাব বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঝিকরা ইউনিয়ন এলাকায় নির্ধারিত সাত কিলোমিটার খাল খনন কাজ অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এই প্রথম প্রকল্পের আওতায় কাজটি পুরোপুরি শেষ করার পরও বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্য থেকে আঠারো লাখ চুরাশি হাজার আটশ টাকা সম্পূর্ণ অব্যয়িত বা সাশ্রয় হিসেবে থেকে যায়। অন্যদিকে, শুভডাঙ্গা ইউনিয়ন এলাকায় মোট সাত কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এর মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার খালের খননকাজ শেষ করার পরেই দেখা যায় যে কাজের মান বজায় রেখেই বিশাল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়েছে। শুধু শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের আংশিক ও ঝিকরা ইউনিয়নের কাজ মিলিয়ে দুই প্রকল্পের মাত্র প্রায় দশ কিলোমিটার খাল খনন শেষ হওয়ার পরই বরাদ্দের তিন কোটি ষাট লাখ টাকার মধ্যে মোট এক কোটি আটচল্লিশ লাখ আটানব্বই হাজার সাতশত বত্রিশ টাকা বেঁচে যায়।

সাধারণত উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত পুরো অর্থই কোনো না কোনোভাবে খরচ করার বা লোপাট করার একটি অসৎ প্রবণতা অতীতে লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বাগমারা উপজেলা প্রশাসনের বিচক্ষণতা ও সদিচ্ছার কারণে এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অপচয় বা তছরুপ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর অব্যয়িত বা সাশ্রয় হওয়া এই ১ কোটি ৪৮ লাখ ৯৮ হাজার ৭৩২ টাকা কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা বা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেলিম আহমেদ অত্যন্ত বিনম্র ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের অর্থের অপপ্রয়োগ বা অপচয় রোধ করাই তাদের মূল দায়িত্ব। সরকারি অর্থ যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি কেবল একটি সাধারণ প্রক্রিয়া নয়, বরং আগামী দিনের জন্য একটি ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় কৃষক, সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ইউএনও সেলিম আহমেদের এই সততা ও সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকটে ভুগতেন, যার স্থায়ী সমাধানের জন্য খাল খনন অত্যন্ত জরুরি ছিল। সরকার পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিলেও অতীতে নানা অনিয়মের কারণে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠত এবং বরাদ্দের পুরো টাকাই নয়ছয় হয়ে যেত। কিন্তু এবার একদিকে যেমন মানসম্মতভাবে খাল খনন করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সরকারের কোটি কোটি টাকা বাঁচিয়ে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, সৎ ইচ্ছা এবং সঠিক মনিটরিং থাকলে সরকারি অনুদানেও দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়।

বাগমারা উপজেলার এই ঘটনাটি বর্তমানে কেবল স্থানীয় পর্যায়েই নয়, বরং পুরো দেশজুড়ে আলোচনার একটি প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ নেটিজেন ও সচেতন নাগরিকরা এই সততার অকুণ্ঠ প্রশংসা করছেন এবং দেশের প্রতিটি দপ্তরে এ ধরনের সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কাম্য বলে মন্তব্য করছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ সাশ্রয় করে তা রাষ্ট্রের তহবিলে ফিরিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি যদি দেশের অন্য উপজেলা ও সরকারি দপ্তরেও ছড়িয়ে পড়ে, তবে জাতীয় অর্থনীতি আরও বেশি শক্তিশালী হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। বাগমারা উপজেলা প্রশাসনের এই সাহসী ও সৎ উদ্যোগের ফলে দেশের অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাঝেও কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার এক দারুণ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত