প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম সফল অগ্রপথিক এবং শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪১২ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তি ও আস্থার মেলবন্ধনে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গত বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ছিল ৩০৭ কোটি টাকা। ফলে তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিকাশের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে ১০৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৪ শতাংশ। এই যুগান্তকারী সাফল্য কেবল একটি একক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং এটি দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শক্তির এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
বিকাশ মূলত দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংকের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠানের পথচলা এবং সফল অংশীদারত্ব দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিকাশের এই বিস্ময়কর মুনাফা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে ব্র্যাক ব্যাংকও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার এক অভাবনীয় রেকর্ড মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বিকাশের মোট শেয়ারের ৫১ শতাংশের মালিকানা রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের হাতে। এই বৃহৎ কাঠামোগত মালিকানার সুবাদে বিকাশের অর্জিত মুনাফার ঠিক ৫১ শতাংশ সরাসরি যুক্ত হয় মূল ব্যাংকটির মুনাফা হিসাবে। ফলে ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্স খাতের পারস্পরিক সম্পূরক ভূমিকা আজ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক দারুণ গতিশীলতা দান করেছে।
আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সাফল্যের এক স্বচ্ছ ও বিস্তৃত চিত্র ফুটে ওঠে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে বিকাশ একা প্রায় ২২৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা। শুধু মুনাফার পরিমাণই নয়, সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও এসেছে ব্যাপক প্রসার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিকাশের মোট রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। গত ছয় মাসে বিভিন্ন ধরনের সেবা ও পরিচালনার বিপরীতে বিকাশের প্রত্যক্ষ খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। এই সুনির্দিষ্ট খরচগুলো বাদ দেওয়ার পর চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিকাশের মোট মুনাফা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই অংকটি ছিল ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এরপর অন্যান্য ব্যবসায়িক আনুষঙ্গিক পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং বিপণন ব্যয় মিটিয়ে বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৪৩৭ কোটি টাকার পোক্ত পরিচালন মুনাফা নিশ্চিত করেছে, যা গত বছর ছিল ৩১৯ কোটি টাকা। মূল পরিচালন মুনাফার পাশাপাশি ব্যাংকে জমা থাকা বিভিন্ন আমানত বা তহবিল থেকে বিকাশ ১৫৯ কোটি টাকার সুনির্দিষ্ট সুদ আয় করেছে। এই সমস্ত পরিচালন মুনাফা এবং ব্যাংকের সুদ আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ তহবিল এবং সরকারের নির্ধারিত কর পরিশোধের পর প্রকৃত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১২ কোটি টাকায়।
একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তিও অত্যন্ত মজবুত। গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রস্তুতকৃত হিসাবের বিবরণী অনুযায়ী, বিকাশের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ১৯৯৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ডিজিটাল ই-মানি ইস্যু এবং সাধারণ গ্রাহকদের আমানত বৃদ্ধির ইতিবাচক সুবাদে বিকাশের ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে’ জমা থাকা অর্থের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এই বিশাল পরিমাণ সংরক্ষিত অর্থ গ্রাহকদের আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে এবং প্রতি মুহূর্তের লেনদেনকে শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত ও সুরক্ষিত রাখছে।
ব্র্যাক ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান মানি ইন মোশনের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালের ২১ জুলাই এক নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটিয়েছিল বিকাশ। সেই সূচনালগ্নে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মী ছিলেন মাত্র ৩৭ জন, আর সাধারণ মানুষের জন্য সেবা ছিল মাত্র তিনটি—ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি। সময়ের পরিবর্তনে আজ সেই ক্ষুদ্র পরিসর এক বিশাল মহীরূহে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি কর্মরত কর্মীসংখ্যা তিন হাজারের অনেক বেশি। আর প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহকের এক বিশাল পরিবার নিয়ে গড়ে উঠেছে বিকাশ নামক আর্থিক আস্থার আশ্রয়স্থল। শুরুর দিকে কয়েক বছর লোকসানের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হলেও পরবর্তীতে তা কাটিয়ে উঠে প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রচলিত সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গত বছর মুনাফা অর্জনকারী শীর্ষ দশটি প্রতিষ্ঠানের একটি ছিল এই বিকাশ। সম্পূর্ণ দেশীয় জনবলের মেধা ও শ্রমের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ আন্তর্জাতিক মানের একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে এর গর্বিত মালিকানায় রয়েছে বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত গেটস ফাউন্ডেশন, চীনের শীর্ষস্থানীয় আলিবাবা গ্রুপের মালিকানাধীন অ্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং জাপানের বিখ্যাত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংক। বিকাশের পেছনে তাদের সম্মিলিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
প্রযুক্তিভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা এই প্রতিষ্ঠানটি যখন ২০১১ সালে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল, তখন মুঠোফোনে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাঠানো ছিল একটি অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় ধারণা। ব্যাংকিং সেবার বাইরে তখন এ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে টাকা পাঠানোর একমাত্র বিকল্প মাধ্যম ছিল কচ্ছপ গতির কুরিয়ার সেবা কিংবা ধীরগতির ডাকঘর। তাতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জরুরি টাকা পৌঁছাতে সময় লাগত কয়েক দিন। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধ করতে কিংবা ব্যাংকে নিজেদের কষ্টার্জিত আমানত জমা করতে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। মানুষের জীবনের সেই ক্লান্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক চিত্রটি আজ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে বিকাশ। বর্তমানে প্রায় ২০০টিরও বেশি প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায় মুঠোফোনে ব্যবহৃত বিকাশের নিজস্ব অ্যাপে। এই বিপুল বৈচিত্র্যের কারণে এটি এখন দেশের প্রধান এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘সুপার অ্যাপ’-এ পরিণত হয়েছে। শুধু প্রথাগত আর্থিক সেবাই নয়, এই অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত গ্রাহকেরা খুব সহজেই তাৎক্ষণিক অতি ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা লাভ করছেন। এই যুগোপযোগী ঋণসেবা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩৫ লাখ গ্রাহক প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ এই ডিজিটাল ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাহিদা মেটাচ্ছেন। শুধু ঋণ গ্রহণই নয়, গ্রাহকেরা খুব সহজেই এখন নিজেদের পছন্দমতো সঞ্চয় বা ডিপিএস স্কিম চালু করতে পারছেন এই বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমেই। সব মিলিয়ে বিকাশ আজ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক জীবনযাপনের অন্যতম অপরিহার্য ও বিশ্বস্ত অনঙ্গ হয়ে উঠেছে।
দেশের স্বনামধন্য আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করেন, বিকাশের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হলো আধুনিক ব্যাংকিং সেবাকে একেবারে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়া। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় এজেন্ট আজ কাজ করছেন জীবন্ত ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে। বিকাশের দ্রুতগতির ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবাসী রেমিট্যান্স এবং শহরের উপার্জিত টাকা খুব সহজে ও নিরাপদে গ্রামে পৌঁছানোর ফলে সামগ্রিকভাবে চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কর্মী এখন নিয়মিত বিকাশের মাধ্যমেই তাঁদের মাসিক বেতন গ্রহণ করছেন, যাঁদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক। এর পাশাপাশি স্বচ্ছতার সাথে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি ভাতাও সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের বিকাশের ঠিকানায়। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ সচেতন গ্রাহক বিকাশের বহুমুখী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডিপিএস ও সঞ্চয় হিসাব খুলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিকাশের এই অবদানের কথা দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে জাতি।